Animal science

তিমি সমাচারঃ ১ (স্পার্ম তিমি)

তিমি শব্দটা শোনার পরেই আমাদের মাথায় প্রথম যে শব্দটা না চাইতেই চলে আসে সেটা হলো মাছ। তবে কালের পরিক্রমায় তিমি যে মাছ নয় এ সম্পর্কে আমরা প্রায় সবাই ই অবগত। তিমি হলো এক প্রকার স্তন্যপায়ী সামুদ্রিক প্রাণী। তিমি হিসেবে আমরা সকলেই এক বাক্যে যাকে চিনি তা হলো নীল তিমি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত নীল তিমির বাইরেও তিমির জগৎ টা কিন্তু নেহাৎ ই ছোট নয়! 

ধারণা করা হয় প্রায় ৮৯ প্রজাতির তিমি রয়েছে আমাদের পৃথিবীতে। বুদ্ধিমত্তার দিক থেকেও তিমির রয়েছে বেশ সুনাম এমনকি কিছু তিমি প্রজাতি তো আমাদের মতো মনের ভাব বিনিময় ও করে থাকে! অনেক গবেষণা বলে তিমিরা নাকি বেশ জটিল পাজেল এবং প্রব্লেম সলভ করতেও পারদর্শী।

 স্তন্যপায়ী প্রাণি হিসেবে তিমিও কিন্তু আমাদের মতোই বায়ুর মাধ্যেমে নিশ্বাস নেয় তাও আবার নাক দিয়েই যা সাধারণত এদের মাথার ঠিক উপরে থাকে। এটাকে তিমির নাসারন্ধ্র বা Blowhole ও বলা হয়ে থাকে। 

শুধু তাই নয়! এরা শুধু নিজের জন্য বাঁচে না! বরং যখন এরা দলবেঁধে থাকে তখন একে অপরকে শিকারেও সাহায্য করে। দলের সবাই যেন খাবার পায় এই বিষয়টিও নিশ্চিত করে থাকে তিমিরা। এমনকি তিমিদের দলে যদি কেউ মারা যায় তাহলে সবাই মিলে শোক প্রকাশ ও করে থাকে! তিমির তেল, দাঁত এমনকি তিমির পাখনা নিয়েও অবাধে এক সময় চলতো আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য।

 তিমি শিকার ছিল একসময়ের বানিজ্যিক শিল্পের অংশ। তবে ১৯৮৬ সালে তিমি হত্যা বাণিজ্যিকভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও এখনো কিছু দেশে এই প্রক্রিয়া চলমান। তিমি সমগ্রের বিভিন্ন পর্বে আমরা তেমনি কিছু তিমি সম্পর্কে অজানা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানবো।

তিমির শ্রেণিবিভাগ

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে তিমির শ্রেনিবিভাগে রয়েছে জটিল কিছু তারতম্য। তবে সাধারণত সকল তিমিকে দুইটা ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়ঃ

১. Toothed Whale বা দাঁতযুক্ত তিমিঃ 

এই শ্রেণিতে তিমির প্রায় ৭৩ প্রজাতি আছে বলে ধারণা করা হয়। সাধারণত এদের শ্রবণ শক্তি খুবই প্রবল থাকে এতে করে অন্ধ দাঁত ওয়ালা তিমিদের বেঁচে থাকতে খুব একটা অসুবিধা হয় না।

ছবিঃ দাঁত ওয়ালা তিমির উদাহরণ, সূত্রঃ ইন্টারনেট।

Scientific Classification:

  • Kingdom: Animalia
  • Phylum: Chordata
  • Class: Mammalia
  • Order: Artiodactyla
  • Infraorder: Cetacea
  • Parvorder: Odontoceti

২.Baleen Whale বা দাঁত ছাড়া তিমিঃ 

প্রায় ১৬ প্রজাতির বেলিন তিমি আছে বলে ধারণা করা হয়। Baleen বা বেলিন হলো একপ্রকার শৃঙ্গাকার ইলাস্টিক উপাদান যা তিমির মুখের মধ্যে তালুর উভয় পাশের উপরের চোয়াল থেকে ঝুলন্ত অসংখ্য প্লেটের একটা সিরিজ গঠন করে। এর মাধ্যমে খাদ্য গ্রহণের সময় মুখে প্রবেশকৃত পানি থেকে  প্ল্যাঙ্কটন বা ক্ষুদ্রমাছ ছেঁকে রেখে পানি বের করে দিতে পারে। দাঁতহীন তিমিদের বৈশিষ্ট্যই এই বেলিন।

ছবিঃ বেলিন তিমির দাঁতের একটি উদাহরণ

Scientific Classification:

  • Kingdom: Animalia
  • Phylum: Chordata
  • Class: Mammalia
  • Order: Artiodactyla
  • Infraorder: Cetacea
  • Parvorder: Mysticeti

আজকের এই পর্বে আমরা দাঁত ওয়ালা তিমিদের মধ্যে অন্যতম এক প্রজাতি Sperm Whale বা Cachalot নামক তিমি সম্পর্কে জানবো।

Sperm Whale/ স্পার্ম হোয়েলঃ 

দাঁতওয়ালা তিমি প্রজাতির মধ্যে সবচে বড় প্রজাতি হলো স্পার্ম হোয়েল। বৈজ্ঞানিক নাম Physeter macrocephalus. লম্বায় প্রায় ৬০ ফিটের মতো এই প্রানির মস্তিষ্কও ওজনে অন্যান্য প্রানির তুলনায় সবচে বেশি যা প্রায় ৯ কিলোগ্রামের কাছাকাছি। 

কালচে ধূসর রঙের স্পার্ম তিমির দেহ অন্যান্য তিমির মতো মসৃণ নয় বরং অনেকটা কুঁচকানো ভাব লক্ষ্য করা যায়। এদের মাথা অনেকটা আয়তাকার এবং দৈর্ঘ্যে তা দেহের তিন ভাগের এক ভাগ। দাঁতওয়ালা তিমি হলেও স্পার্ম হোয়েলদের কেবল নিচের চোয়ালে দাঁত থাকে। অন্যান্য তিমির নাসারন্ধ্র মাথার ঠিক উপরের দিকে থাকলেও স্পার্ম হোয়েলের নাসারন্ধ্র বা blowhole থাকে মাথার সামনের দিকে এবং আকৃতি হয় অনেকটা S এর মতো বা কখনো মানুষের দুই ঠোঁটের মতো। 

দেখতে কিম্ভূতকিমাকার স্পার্ম হোয়েল আরো একদিক দিয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আর তা হলো এরা সবচে গভীরে (প্রায় ৩০০০ মিটার পর্যন্ত) খাদ্যের উদ্দেশ্য যেতে পারে। গবেষণা বলে, এরা প্রায় দুই ঘন্টার মতো নিশ্বাস ধরে রাখতে সক্ষম!

খাবার হিসেবে এদের প্রাধান তালিকায় থাকে বিশাল আকৃতির স্কুইড, অক্টোপাস এবং বিভিন্ন প্রকারের বড় মাছ। অ্যাণ্টারটিকা থেকে আর্কটিক সব মহাসাগরেই এরা বিচরণ করতে পারে। এরা প্রায় ৭০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

ছবিঃ অ্যাম্বারগ্রিস

এবার আসি স্পার্ম হোয়েল নামকরণে। আমরা অনেকেই জানি স্পার্ম বা শুক্রাণু(Male sex cell) যৌন জনন প্রক্রিয়ার অংশগ্রহণকৃত পুরুষের দেহে থাকা একধরণের কোষ বা cell. তাহলে কি স্পার্ম উৎপন্ন করতে সক্ষম বলেই এমন নামকরণ? একদম ই নয়!

১৮-১৯ শতকের দিকে যখন তিমি শিকারের প্রকপ ছিল ভয়ংকর, তখন ইংল্যান্ডের কিছু তিমি শিকারিরা মৃত স্পার্ম তিমির থেকে ব্যাপারটি আবিষ্কার করে। স্পার্ম তিমির মাথার বেশির ভাগ অংশ জুড়ে স্পারমাসেটি (Spermaceti) নামক একটি অর্গান বা অঙ্গ বিদ্যমান। এটি এক ধরনের সাদা মোমের মতো আংশিক তরল পদার্থ উৎপন্ন করে থাকে যা প্রায় আয়তনে ২০০০ লিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। একে Sperm oil ও বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে এই spermaceti শব্দ থেকেই এই প্রজাতির সাধারণ নামকরণ হয় sperm whale।

তবে এই  স্পারমাসেটি নামক অঙ্গের কাজ কি তা সম্পর্কে সঠিক ধারণা এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। এই বিষয়ে দুইটি ধারণা পাওয়া যায়। হতে পারে তিমিদের ভাসিয়ে  রাখা বা সর্বোচ্চ গভীরে যেতে পারার ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করে এই অঙ্গটি। আবার তিমির শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে স্পারমাসেটি নামক অঙ্গটি। তবে এই ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে স্পার্ম তিমিকে অন্যান্য তিমি থেকে আলাদা প্রমাণ করে থাকে৷

তিমি তার নিজের কোন কাজে এই অঙ্গটি ব্যবহার করে সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হলেও মানুষ কিভাবে এটি তার নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে এসেছে তা জেনে নিই চলুন!

মানুষ যখন এই ব্যাপারটি আবিষ্কার করলো তখন থেকেই এটিকে কাজে লাগানোর বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। ১৯ শতকের দিকে বিভিন্ন ধোঁয়াহীন মোম, শিল্পসংস্থায় ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের লুব্রিক্যান্ট, বিভিন্ন প্রকারের প্রসাধনী, মলম ইত্যাদি বানানোর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো স্পার্ম হোয়েলের এই Sperm oil জাতীয় তরলটি।

স্পার্ম হোয়েলের আরো একটা উপাদান শিল্প ক্ষেত্রে দারুণ প্রয়োজনীয় ছিল তা হলো এর বমি। জ্বি। ঠিক ই বলছি। কিভাবে? চলুন জেনে আসি।

আগেই বলেছি এরা বিশাল আকৃতির স্কুইড খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে! তবে কিছু ক্ষেত্রে স্কুইডের মুখের অংশ স্পার্ম তিমিরা হজম করতে পারে না। এর ফলে তা বমি আকারে বা কখনো মল আকারে দেহ থেকে বের করে দেয়। সাধারণত স্পার্ম হোয়েলের মল কিংবা বমি দেখতে অনেকটা শক্ত কালচে ধূসর রঙের পদার্থ। একে অ্যাম্বারগ্রিস (Ambergris) বা অম্বর বলে।

ছবিঃ অ্যাম্বারগ্রিস

এই অ্যাম্বারগ্রিসের মূল্য প্রতি কেজি প্রায় 136,567.30$। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় কত হচ্ছে একটু হিসেব করে দেখে ফেলুন তো! তাই স্পার্ম হোয়েলের বমিকে সামুদ্রিক সোনা হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এটি যেকোনো ঘ্রাণকে দীর্ঘকাল ধরে রাখতে পারে বলে অ্যাম্বারগ্রিসকে সাধারণত ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন পারফিউম ম্যানুফ্যাকচারিং এর কাজে।

এবার কিছু তথ্য এক নজরে দেখে আসি

• যদি বলি এরা অনেকটা দাঁড়িয়ে ঘুমায়? হ্যাঁ! স্পার্ম হোয়েলরা সাধারণত ঘুমানোর ক্ষেত্রে মাথা সমুদ্র পৃষ্ঠের দিকে দিয়ে উলম্বভাবে দল বেঁধে ঘুমায়।

ছবিঃ স্পার্ম তিমিদের ঘুমের দৃশ্য

• পুরুষ স্পার্ম হোয়েলরা একত্রে দলবেঁধে থাকে কখনো বা একা থাকতেই পছন্দ করে।

• স্ক্রী স্পার্ম হোয়েলরা দলবেঁধে থাকতেই ভালোবাসে। বাচ্চা স্পার্ম হোয়েল কে বড় করা এবং পরিবেশের সাথে খাপখাওয়ানোর কাজটা প্রধানত মা স্পার্ম হোয়েল ই করে থাকে৷ তবে দলে বাচ্চা স্পার্ম হোয়েলের নানি, দাদি, খালামনিরাও থাকে এবং বাচ্চা স্পার্ম হোয়েল কে সবসময় সবাই মিলে আগলে রাখে। কখনো কখনো আমাদের মা-খালামনিদের মতো সুখ দুঃখের গল্প ও করে স্পার্ম তিমিরা ।

• স্পার্ম হোয়েলরা ভাব বিনিময়ের জন্য ক্লিক ক্লিক জাতীয় শব্দ উৎপন্ন করে থাকে। নিজেদের মধ্যে অবসর সময়ে গল্প করতে ভীষণ ভালোবাসে বলেও ধারণা করা হয়।

• এরা শিকার ধরার ক্ষেত্রেও দলবেঁধে কাজ করে। একা নিজের কথা ভাবে না। বরং দলের সবাই যেন খাবার পায় এই বিষয়টি পুরুষ স্পার্ম হোয়েল নিশ্চিত করে। দল বেঁধে চলা তিমিদের দলকে বলা হয় পড বা Pod.

• অন্যান্য তিমিদের মতো এরাও ইকোলোকেশন বা ভোকালাইজেশন এর মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা এবং শিকার করে থাকে। স্পার্ম তিমিরা সর্বাধিক উচ্চস্বর উৎপন্ন করতে সক্ষম যা জেট বিমানের টেক অফের শব্দের চেয়েও উচ্চমাত্রার।

• নিজেদের প্রতি দায়িত্বশীল স্পার্ম তিমিদের অবশ্য তাদের স্ব-বর্গের কিলার হোয়েল বা খুনে তিমির শিকার হতে হয় কখনো কখনো।

হতাশার কথা এটাই যে  মানুষের অসচেতনতায় বর্তমানে স্পার্ম হোয়েল প্রজাতি বিলুপ্ত হতে বসেছে। তিমি শিকার বন্ধ করা হলেও এখনো অনেক দেশ অনেক ভাবে তিমি হত্যায় লিপ্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, সমুদ্রের দূষণ, প্লাস্টিকের আধিক্য ইত্যাদি নানা কারণে স্পার্ম হোয়েলের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। আমরা যদি এখনো সচেতন না হই তাহলে অচিররেই স্পার্ম তিমিরা হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাসের পাতাতেই রয়ে যাবে।


নোশিন তাবাসসুম হৃদিতা

১ম বর্ষ

সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

তথ্যসূত্রঃ

https://www.sciencenewsforstudents.org/?s=whale

https://www.thoughtco.com/types-of-whales-2292021

https://www.whale-world.com/types-of-whales/

https://www.whalewatch.co.nz/our-nature/marine-life/whales/

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button