EnvironmentFeature

ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পানি নিরাপত্তা: জীবপ্রযুক্তির ভূমিকা

২২ মার্চ ‘বিশ্ব পানি দিবস’। ১৯৯৩ সাল থেকে দিবসটি প্রতি বছর পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। এবারের পানি দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘পানির মূল্যায়ন করা’। বিশ্বের ২২০ কোটি লোকের যথাযথ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যায়নি এখনো। এ ব্যাপারে যথেষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেই এ প্রতিপাদ্য গৃহীত হয়েছে। আজকে আমরা জানব পানির সংকট মোকাবিলায় এবং সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতকরণে জীবপ্রযুক্তি কী কী উপায়ে সাহায্য করতে পারে। 

২০১৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০৫০ থেকে বিশ্বের শতকরা ৫৭ ভাগ মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস পানির সংকটে ভুগবে। তবে এখন থেকেই যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এ পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। এর জন্য পানির অপচয় রোধ, দূষিত পানির বিশোধন, লবণাক্ত পানিকে পানযোগ্য পানিতে রূপান্তর, বিভিন্ন কাজে পানির প্রয়োজন কমিয়ে আনার প্রযুক্তি ইত্যাদি সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব কাজে জীবপ্রযুক্তির ভূমিকা নিচে তুলে ধরছি:

১। খরা সহনীয় ফসল: পানি ব্যবহার হয় প্রধানত ৩টি ক্ষেত্রে; কৃষি কাজে, শিল্পকারখানায় ও মানুষের আনুষাঙ্গিক নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পানির প্রয়োজন হয় কৃষি কাজে। বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির শতকরা ৯০ ভাগ ব্যবহৃত হয় সেচ কাজে। তাই কম পানি ব্যবহারে ফসল উৎপাদন করা গেলে বিপুল পরিমাণ পানি প্রয়োজনীয়  অন্যান্য কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ থাকবে। উদ্ভিদের জিনের পরিবর্তন ঘটিয়ে বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ফসলের খরা সহনীয় জাত তৈরি করতে পেরেছেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ধান, গম, ভুট্টার খরা সহনীয় জাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চাষ হচ্ছে। এ সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত গবেষণা হলে আশা করা যায় ভবিষ্যতে বেশি সংখ্যক খরা সহনীয় উদ্ভিদ জাত তৈরি সম্ভব হবে এবং এর চাষও উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাবে।

 ২। লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল: সমুদ্রের লবণাক্ত পানি মানুষের পানযোগ্য নয়। উপরন্তু মানুষের খাদ্যের উৎস যেসব ফসল সেগুলোও সাধারণত লবণাক্ত পানিতে চাষযোগ্য নয়। সমুদ্র তীরবর্তী যেসব এলাকার পানিতে লবণের পরিমাণ বেশি, সেসব এলাকায়  শস্য ফলানো গেলে অব্যবহৃত পানির ব্যবহার করা যাবে। এ উদ্দেশ্যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে লবণাক্ততা সহিষ্ণু উদ্ভিত তৈরি করা গেছে। ব্রি ধান ৪৭, ব্রি ধান ৬১, ব্রি ধান ৬৭ লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের জাত। বাগেরহাট, খুলনা অঞ্চলে এ জাতের ধান কৃষকরা আবাদ করছেন। গবেষণা ও যুগোপযোগী গবেষণার মাধ্যমে নিত্য নতুন লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় চাষ করলে অনেক পতিত জমি যেমন ব্যবহার হবে, একই সাথে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমে যাবে যা মানুষ অন্যান্য জরুরি কাজে ব্যবহার করতে পারে। 

 ২। পানি বিশোধন: খাবার পানির অপ্রতুলতার একটি প্রধান কারণ পানি দূষণ। দূষিত পানি গ্রহণের ফলে টাইফয়েড, জন্ডিস, কলেরাসহ বিবিধ রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। পৃথিবীতে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ পানিবাহিত রোগ। বিভিন্ন দেশে শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ির ব্যবহৃত পানি বিশোধন না করেই নদীতে, বিলে মুক্ত করা হয়। এর ফলে নদীর পানি, বিলের পানি পার্শ্ববর্তী জনপদ ব্যবহার করতে পারে না। ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করে ব্যবহার করতে হয়। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমছে ক্রমাগত। বিভিন্ন অণুজীব পানিতে থাকা দূষণকারী পদার্থকে বিয়োজন করে ফেলে পানি বিশোধন করতে সক্ষম। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে অণুজীবের এ ক্ষমতা বিজ্ঞানীরা আরও বাড়িয়ে তুলছেন। ওয়েস্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে শিল্পকারখানা, গৃহস্থালীর ব্যবহৃত পানি বিশোধিত করে পরিবেশে মুক্ত করলে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ ও পানিবাহিত রোগের সংক্রমণও রোধ করা সম্ভব। 

বিজ্ঞান একটি চলমান প্রক্রিয়া। উত্তরোত্তর মানুষ তার অনুসন্ধিৎসা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতিকে জানছে, অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাচ্ছে নিজেরসহ বিশ্বের সকল প্রাণের মঙ্গলের জন্য। আর প্রাণের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য উপাদান পানি। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে  জীবপ্রযুক্তির গবেষণা ও অর্জিত জ্ঞানের যথোপযুক্ত ব্যবহার ভবিষ্যত পৃথিবীর পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। 


পঙক্তি আদৃতা বোস

২য় বর্ষ,

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, 

ঢাকা-১১০০।

তথ্যসূত্র:

১। www.ais.gov.bd

২।  http://www.brri.gov.bd 

৩। Drinking Water, WHO

৪। https://www.unwater.org/water-facts/scarcity/

৫। Effectiveness of wastewater treatment systems in removing microbial agents: a systematic review, NCBI 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button