Health

থ্যালাসেমিয়া ও বাংলাদেশ

পঙক্তি আদৃতা বোস

জন্মগত রোগগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব থ্যালাসেমিয়া রোগের। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর দেশে প্রায় ৭,০০০ শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৭০,০০০ শিশু এ রোগে আক্রান্ত। অথচ রোগের ব্যাপকতার তুলনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা নগন্য। 

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। আফ্রিকান-আমেরিকান, ভূমধ্যসাগরীয় ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভুতদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগটি বেশি দেখা যায়। এটি রক্তের এক ধরনের অস্বাভাবিকতা। 

চিত্র: থ্যালাসেমিয়াসেন্টার, ঢাকাশিশুহাসপাতাল
সূত্র: Thalassaemia Center 

রক্ত তিন ধরনের কণিকা দিয়ে গঠিত; লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা। রক্তের শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই লোহিত রক্তকণিকা। 

লোহিত রক্তকণিকাতে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের প্রোটিন; যার নাম হিমোগ্লোবিন। এই হিমোগ্লোবিনের কারণেই আমাদের রক্তের রং লাল। শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়ার কাজটি করে হিমোগ্লোবিন। 

কিন্তু থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণ হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। ফলে শরীরের কোষগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পরিবাহিত হয় না এবং রোগীর দেহে রক্তশূন্যতাসহ বিভিন্ন রকম অস্বস্তি ও অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত সকলের দেহে একই লক্ষণ প্রকাশ পায় না এবং লক্ষণের তীব্রতাও রোগটির ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়।

হিমোগ্লোবিন উৎপাদনকারী কোষের মিউটেশনের (কোষের জিনগত পরিবর্তন) ফলে থ্যালাসেমিয়া হয়। মা কিংবা বাবা অথবা উভয়ের মাধ্যমে সন্তানের দেহে এ ধরনের মিউটেটেড জিন পরিবাহিত হতে পারে। 

থ্যালাসেমিয়া প্রধানত ২ ধরনের হয়-

  • আলফাথ্যালাসেমিয়া: হিমোগ্লোবিনের আলফা চেইনে মিউটেশনের উপস্থিতি। 
  • বেটাথ্যালাসেমিয়া: হিমোগ্লোবিনের বেটা চেইনে মিউটেশনের উপস্থিতি।  

আলফা-থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা নির্ভর করে মা-বাবা থেকে সন্তান হিমোগ্লোবিনের আলফা চেইনে কতটি মিউটেশন পেয়েছে তার উপর। 

অন্যদিকে, বেটা-থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা নির্ভর করে হিমোগ্লোবিন চেইনের কোন অংশে মিউটেশন রয়েছে তার উপর। 

আলফা-থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি যদি মাত্র একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেন তাহলে তার মধ্যে কোনো লক্ষণই প্রকাশ পাবে না যদিও তিনি এ রোগের বাহক হিসেবে থাকবেন। অর্থাৎ, তার থেকে তার সন্তানের মধ্যে এই জিন পরিবাহিত হতে পারে। সন্তানের অপর প্যারেন্টও থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের একাধিক জিনে থ্যালাসেমিয়াজনিত মিউটেশন থাকার সম্ভাবনা ও সন্তানের অসুস্থ হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। 

সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার সময় থেকেই থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার অনেক শিশুর জন্মের দুই বছরের মধ্যে কোনো এক সময় লক্ষণ প্রকাশিত হয়। তবে থ্যালাসেমিয়া সংশ্লিষ্ট শুধুমাত্র একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। 

থ্যালাসেমিয়ার সাধারণ কিছু লক্ষণ হল-

  • ক্লান্তি বোধ
  • দুর্বলতা
  • বিবর্ণ বা হলদে গায়ের রং
  • মুখমণ্ডলের হাড়ের বিকৃতি
  • ফাঁপা পেট
  • প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া
  • ধীর শারীরিক বৃদ্ধি (slow growth) 

থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা মাঝারি পর্যায়ের হলে যেসব লক্ষণ দেখা যায়, সেগুলো হল-

  • শরীরে আয়রনের আধিক্য: 

থ্যালাসেমিয়া রোগীর শরীরে বার বার রক্ত গ্রহণ কিংবা রোগটি থেকেই আয়রনের আধিক্য তৈরি হতে পারে। শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ আয়রনের উপস্থিতি হৃদপিণ্ড, যকৃত ও অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। 

  • শরীরে প্রদাহ সৃষ্টির ঝুঁকি বৃদ্ধি: 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের প্রদাহতে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়। 

থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা বেশি হলে নিম্নলিখিত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে-

  • হাড়ের গঠনে অস্বাভাবিকতা;
  • প্লীহা আকারে বড় হওয়া;
  • থ্যালাসেমিয়ার কারণে শরীরে রক্তশূন্যতা হওয়ায় সন্তানের শৈশব ও কৈশোর উভয় বয়সেই স্বাভাবিকের চেয়ে কম শারীরিক বৃদ্ধি হতে পারে;
  • থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা অত্যন্ত বেশি হলে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন ও কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিওর (congestive heart failure) এর ঝুঁকি বেড়ে যায়। 

মাঝারি থেকে তীব্র পর্যায়ের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যহত হয়, অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু ঝুঁকিও থাকে তীব্র। থ্যালাসেমিয়া মেজরে (একাধিক ত্রুটিপূর্ণ জিনের উপস্থিতি) আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই জন্মের প্রথম ৫ বছরের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করে এবং গড়ে থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আয়ুষ্কাল মাত্র ৩০ বছর। এ ধরনের রোগীদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মাসে সাধারণত ১-২ ব্যাগ রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়। 

এছাড়া থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধের বেশিরভাগই আমাদের দেশে তৈরি না হওয়ায় বিদেশ থেকে সেসব রপ্তানি করতে হয়। অতএব, রোগটির চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এই রোগ কারো থাকলে মেরুরজ্জু প্রতিস্থাপন (bone marrow transplantation) ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে তাকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব না। কিন্তু মেরুরজ্জু প্রতিস্থাপন একই সাথে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। 

তাই প্রায় সব ক্ষেত্রেই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জীবনব্যাপী নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় এখানে বেশিরভাগ রোগীরই এ চিকিৎসা গ্রহণে প্রয়োজনীয় আর্থিক সঙ্গতি নেই। 

থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রতিরোধই এ রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। মা-বাবা উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা অধিক। এ কারণে বিশেষজ্ঞগণ বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পরামর্শ দেন। তারপরও কোন দম্পতির উভয়ে থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে অবশ্যই একজন জেনেটিক কাউন্সেলর অথবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। জন্মদান প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা এড়াবার পাশাপাশি, মা ও শিশু উভয়ের সুস্থতার জন্য দম্পতির কোনো একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলেও সন্তান গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৭ ভাগ মানুষ অর্থাৎ ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের গ্রামে বসবাসরত শতকরা প্রায় ২৮ ভাগ নারী বেটা-থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত।  বাহকদের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গেলেই এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও এর প্রচারের মাধ্যমেই ভবিষ্যতের শিশুদের থ্যালাসেমিয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। 


পঙক্তি আদৃতা বোস

শিক্ষার্থী,

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১১০০। 

তথ্যসূত্র: 

 ১। Thalassemia – Symptoms and causes 

 ২। Role of Different Types of Blood Cells 

 ৩। Thalassaemia: The present and future for Bangladesh 

 ৪। WHO | Global epidemiology of haemoglobin disorders and derived service indicators

 ৫। Thalassemias in South Asia: clinical lessons learnt from Bangladesh

 ৬। Bangladesh Thalassemia Foundation 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button