Biotechnology

অমরত্ব ও টেলোমিয়ারের গল্প

বিভিন্ন গল্প ও কল্পকাহিনীতে আমরা দেখি,কিছু মানুষ অমর হতে চায় কিংবা হয়েই গেছে।আমাদের ফ্যান্টাসি গল্পের প্রিয় গ্রীক দেবতারা অমর।মানবজাতি জানে তাদের প্রত্যেককেই একদিন না একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে,এরপরও তারা বেঁচে থাকতে চায়,যতটা দিন সম্ভব।মানবজাতি কি কোন দিন পারবে মৃত্যুকে জয় করতে?কখনো কি পারবে অমরত্বের জীয়নকাঠি হাতে নিতে?এটা কি সম্ভব?আমাদের বায়োটেকনোলজিস্টরা কি বলছেন??এটাই হতে যাচ্ছে আমাদের আলোচনার মূল বিষয় বস্তু।

যাদের প্রাণ আছে,তাদের একসময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হয়।প্রাণ কি?আমাদের বায়োলজিস্টগন জীবদেহের সজীব প্রোটোপ্লাজমকেই প্রাণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।জীবদেহ একসময় তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে,যাকে আমরা মৃত্যু বলে আখ্যায়িত করি।এক্ষেত্রে আমরা জীবদেহকে একটি ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করতে পারি।অসীম কর্মক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব নয়,এটা আমাদের পদার্থবিদগন থিওরীটিক্যালি প্রমান করেছেন।একইভাবে জীবদেহও অসীম কর্মক্ষমতা সম্পন্ন নয়।জীবদেহ যে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষ দিয়ে তৈরি,সেই কোষগুলোও কিছুটা বায়োলজিকাল ইঞ্জিনের মত কাজ করে।কোষ তৈরি হয়,এটি ATP,NADP,NADH প্রভৃতি থেকে শক্তি গ্রহন করে,জীবদেহের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করে এবং একসময় কোষ নষ্ট হয়, কোষের মৃত্যু ঘটে।

আমরা যদি অমরত্বের স্বাদ পেতে চাই,তাহলে আমাদের কোষগুলোকে হতে হবে অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনের মত।কোষের মৃত্যু হওয়া যাবে না,বিভাজিত হওয়া যাবে না।কোষগুলোকে এনার্জি সাপ্লাই নিতে হবে,নির্দিষ্ট কাজ করতে হবে এবং কাজ শেষে কোষটিকে অপরিবর্তিত থাকতে হবে।আমরা যদি কোনভাবে এই কোষগুলোকে গঠনে,রাসায়নিক ভাবে সৃষ্টি হবার পর অপরিবর্তিত রাখতে পারি,তাহলে হয়তো অমরত্ব লাভ করা সম্ভব।

আমরা ছোট থেকে বড় হই।দেহকোষে মাইটোসিস বিভাজনের জন্য আমরা বেড়ে উঠি।কোষবিভাজনের একটি ধাপে আমাদের ক্রোমোজোমগুলো রূপ নেয় একটি বিশেষ গঠন,ক্রোমাটিডে।এই ক্রোমাটিড এর শেষ দুই প্রান্তে পুনরাবৃত্তি মুলক একটি নিউক্লিওটাইড ক্রম বা সিকোয়েন্স দেখা যায়।সিকোয়েন্সটি হলো – TTAGGG।এটি জিনোমকে নিউক্লিওলাইটিক ডিগ্রেডেশন,অপ্রয়োজনীয় রিকম্বিনেশন ও রিপেয়ার এবং ইন্টারক্রোমোজোমাল ফিউশন থেকে রক্ষা করে।এটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি হলো – আমাদের জিনোমে নির্দিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ করা।এই সিকোয়েন্সটি,যেটিকে টেলোমারেস বলা হয়,এটির অবস্থান ক্রোমাটিডের শেষ দুই প্রান্তে এবং কোষ প্রতিবার বিভাজনের সময় এই সিকোয়েন্সটি আকারে ছোট হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে সিকোয়েন্সটি ছোট হতে হতে একটি ক্রিটিক্যাল লিমিটে পৌছালে কোষের এপোপটোসিস তথা মৃত্যু ঘটে।টেলোমারেসের দৈর্ঘ্যকে একটি কোষের লাইফস্প্যান বলে আখ্যায়িত করা হয়।টেলোমারেস এজিং(Ageing) বা আমাদের বৃদ্ধ হবার জন্যও দায়ী।মূল কথা – প্রতিবার ডিএনএ রেপ্লিকেশনের পর টেলোমারেস ছোট হয়ে যায় ফলশ্রুতিতে ক্রোমোজোমাল ডিগ্রেডেশন ঘটে এবং সবশেষে কোষের মৃত্যু ঘটে।

টেলোমারেসের সাথে অমরত্বের সম্পর্ক এটাই,আমরা যদি কোনভাবে কোষ বিভাজনের পর এই টেলোমারেস সিকোয়েন্সটি অপরিবর্তিত রাখতে পারি বা সেটা যদি দৈর্ঘ্যে না কমে তাহলেই একটি কোষ আর এপোপটোসিসের শিকার হবে না।অর্থাৎ,কোষের মৃত্যু ঘটবে না।আমরা বুড়ো হবো না।আমরা যদি একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর,নিউক্লিওটাইড বেসগুলোর মডিকেশন ঘটিয়ে টেলোমারেস সিকোয়েন্সটিকে অপরিবর্তিত রাখতে পারি,তাহলে হয়তো অমরত্ব সম্ভব।কোষ সৃষ্টি হচ্ছে,তা শক্তি গ্রহন করছে,তার নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করছে একইসাথে বিভাজিত হবার পর তার টেলোমারেসকে অক্ষত রাখছে।কিংবা কোষগুলো তার বিভাজনই বন্ধ করে দিয়েছে – এটাই হতে পারে অমরত্ব লাভের সম্ভাব্য বায়োলজিক্যাল উপায়।আমরা যদি ক্যান্সার কোষের দিকে লক্ষ্য করি,দেখা যাবে সাধারণ কোষ বিভাজনের পর যেখানে টেলোমিয়ার এর দৈর্ঘ্য হারাচ্ছে,সেখানে ক্যান্সার কোষ টেলোমারেস রিএক্টিভেশন বা রিকম্বিনেশন বেসড মেকানিজম এর মাধ্যমে তার টেলোমারেস দৈর্ঘ্য অপরিবর্তিত রাখছে।হয়তো,এই ক্যান্সার সেল এর মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে অমরত্বের খোঁজ।

আমি কথাগুলো যত সহজে বললাম – বাস্তবে তা করা অসম্ভব একটি কাজ।জীবদেহে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষ রয়েছে।তারা প্রতিদিন বিভাজিত হচ্ছে,প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন কোষের মৃত্যু হচ্ছে।প্রতিদিনই বিলিয়ন বিলিয়ন টেলোমারেস সিকোয়েন্স দৈর্ঘ্যে ছোট হচ্ছে।তাই জীবদেহ বুড়িয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।অমরত্ব হলো সেই ধারনা – যেটি বায়োটেকনোলজির সর্বশেষ ধাপ।যতদিন যাবে,বায়োটেকনোলজি উন্নত হবে কিন্তু অমরত্ব লাভ করার পর বায়োটেকনোলজির আর কোন কাজ থাকবে না।বিজ্ঞানের কাজই যেখানে সামনে এগিয়ে যাওয়া,সেখানে হয়তো আমরা কখনও দেখতেও পারি মানবসভ্যতা অমরত্বকে ছুঁয়ে দিয়েছে।সেই অপেক্ষায় বসে রইলাম।


তাসনিম রাফাত

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ

৪র্থ বর্ষ ১ম সেমিস্টার

[Source of Information – Lehninger Principles of Biochemistry, Wikipedia]

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button