Microbiology

গুটি বসন্ত নির্মূলকরণ: ভ্যাক্সিন উদ্ভাবন ও প্রথম অতিমারীর অবসান

জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তায় আণবিক যে রহস্য বারবার বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছে এবং জনসাধারণকে করেছে আতঙ্কিত তা হল ভাইরাস। তাকে না জড়’র তালিকায় লিপিবদ্ধ করা যায়, না যায় তাকে জীবের (উদ্ভিদ ও প্রাণী) কাতারে দাঁড় করানো। ভাইরাস এমন এক সত্তা যা অন্য কোনো জীবের আশ্রয় ছাড়া বিপাক ও সংখ্যা বৃদ্ধি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে না। অন্যদিকে, কোনো জীবনকে আশ্রয় না করেও টিকে থাকতে পারে বছরের পর বছর এবং সুযোগ পেলেই জীবদেহে ঢুকে তাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীতে ঘটা অতিমারিগুলোরও অন্যতম কারণ ভাইরাস। বর্তমানেও আমরা এক অতিমারি পার করছি সার্স-কোভিড-২ (Orthocoronavirinae) নামক ভাইরাস সৃষ্ট রোগে।

কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাবের এক বছরের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা প্রতিরোধমূলক সমাধান ভ্যাক্সিন তৈরি করে ফেলেছে যা আমাদের কোভিড-১৯ রোগের অতিমারি থেকে মুক্তি পাবার ব্যাপারে আশান্বিত করছে। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম ভ্যাক্সিন তৈরির ইতিহাস এতটা কম সময়ের না। মানুষ এখন পর্যন্ত যে অতিমারি সৃষ্টিকারী রোগকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে পেরেছে, তা হল গুটি বসন্ত। গুটি বসন্ত নির্মূলকরণ জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত। গুটি বসন্ত অত্যন্ত ভয়ংকর একটি রোগ। চার ধরনের ভাইরাসের কারণে এ রোগ সৃষ্টি হয়; variola major ও variola minor সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর মধ্যে বেশি বিপজ্জনক variola major দ্বারা সৃষ্ট গুটি বসন্ত। Variola major দ্বারা সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত প্রতি ১০ জনে তিনজনই মারা যেত এবং variola minor-এ আক্রান্তের মৃত্যুহার ছিল শতকরা ১ ভাগ অথবা তারও কম।  সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদেরও সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হত এ রোগে সৃষ্ট ক্ষত চিহ্ন।  

ইরানে পাওয়া তিনটি মমির গায়ে গুটি বসন্তের মতো চিহ্ন দেখা গেছে। এ থেকে গবেষকরা অনুমান করেন, পারস্য সাম্রাজ্যেও (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী) গুটি বসন্তের প্রাদুর্ভাব ছিল। ধারণা করা হয়, কমপক্ষে ৩০০০ বছর ধরে গুটি বসন্ত মানুষকে অসুস্থ করেছে। ১৭৯৬ সালে বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার ‘ভ্যারিওলেশন’ নামক এক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খুঁজে পান। ভ্যারিওলেশন প্রক্রিয়ায় মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে আক্রান্ত স্থানের কোন তরল বা চামড়া নিয়ে তা চূর্ণ করে অথবা শুকিয়ে সুস্থ মানুষের শরীরে স্পর্শ করানো হত। এতে দেখা গিয়েছিল, প্রাকৃতিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির চেয়ে ভ্যারিওলেশন প্রক্রিয়ায় গুটি বসন্তে আক্রান্ত রোগীর লক্ষণ লঘু হবার হার বেশি। এ প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুহার ছিল শতকরা ২-৩ ভাগ। প্রাচীন আফ্রিকায়, চায়নায় এবং ভারতবর্ষে লোক মুখে এ প্রক্রিয়া পরিচিত ছিল এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই মানুষ এ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে রোগের ভয়াল রূপ থেকে রক্ষা পাবার চেষ্টা করত। বৃটিশ অভিজাত নারী, কবি ও লেখিকা লেডি ম্যারি ওয়ার্টলে মন্টাগু তুর্কিতে থাকাকালীন এ পদ্ধতি অবলোকন করেন। তার ছোট ভাই গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল । ইংল্যান্ডে ফিরে এসে লেডি মন্টাগু বৃটিশ রাজপরিবারে এ পদ্ধতি প্রচলন করেন এবং রাজপরিবারের একজন সদস্য ব্যতীত সকলের ক্ষেত্রেই এ পদ্ধতি সফল হয়েছিল। এরপর ব্রিটেনে এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৭৯৬ সালে বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার আবিষ্কার করেন যে, গরুর এক প্রকার বসন্ত রোগে (cowpox) আক্রান্ত স্থানের রস মানুষের সংস্পর্শে আনলে মানুষের শরীরে গুটি বসন্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এ পদ্ধতি ইংল্যান্ডের চিকিৎসক ও জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। ১৭৯৬ সালে ৮ বছর বয়সী এক বালকের উপর তিনি এ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন এবং বালকটি ২ সপ্তাহের মধ্যেই কাউপক্সের লঘু উপসর্গ থেকে মুক্তি পায় এবং পরবর্তীতে স্মল পক্সের সংস্পর্শে এলেও এ রোগে আক্রান্ত হয় না। এভাবে এডওয়ার্ড জেনার প্রথম ভ্যারিওলেশন হাইপোথেসিসকে প্রমাণ করেন এবং ভ্যাক্সিনেশনের দুয়ার খুলে যায়।

১৯৫৮ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে এক আন্তর্জাতিক ভ্যাক্সিনেশনের মাধ্যমে গুটি বসন্ত রোগকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব হয়। 

প্রাকৃতিকভাবে variola major-এ আক্রান্ত সর্বশেষ রোগী ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে চিহ্নিত হয়েছিল। ৩ বছর বয়সী রহিমা বানু এ রোগে আক্রান্ত সর্বশেষ এশীয় মানুষ হিসেবেও চিহ্নিত। তাকে আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করবার পর থেকে সে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা তার ঘরের পাশে পাহারা বসানো হয়েছিল রোগটির সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে। দ্রুততার সাথে তার বাড়ির ১.৫ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে অবস্থিত সকল বাড়ির লোককে ভ্যাক্সিন দেয়া হয়। কোনো ব্যক্তি স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোকে গুটি বসন্তে আক্রান্ত রোগীর ব্যাপারে অবগত করলেও আর্থিকভাবে তাকে পুরস্কৃত করা হত। ১৯৭৭ সালে সোমালিয়ায় চিহ্নিত হয় variola minor-এ আক্রান্ত সর্বশেষ রোগী। তিনিও এ রোগ থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং ২০১৩ সালের ২২ জুলাই ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি পোলিও রোগ নির্মূলকরণ কর্মসূচীতে কর্মরত ছিলেন। 

দ্রুততার সাথে সম্মিলিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গুটি বসন্ত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে গবেষণামূলক কাজের জন্য পৃথিবীর দুইটি ল্যাবরেটরিতে এই ভাইরাস সংরক্ষিত আছে। যার একটি হলো, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অণুজীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্র (State Centre for Research on Virology and Biotechnology). অপরটি, আটলান্টার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রসমূহের (Centers for Disease Control and Prevention) একটি গবেষণাগার। যদিও এই সকল সংরক্ষিত নমুনাকে জীবাণু যুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণে আন্তর্জাতিক মহলে সর্বশেষ নমুনাগুলো ধ্বংস করার প্রস্তাবনা উত্থাপিত হচ্ছে।

হাজার বছরের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ভয়ঙ্কর গুটি বসন্তের অতিমারী কাটিয়ে উঠতে পারলেও কখনোই যে আর এই প্রাণঘাতী রোগ মানবজাতিকে বিপর্যস্ত করবে না তার নিশ্চয়তা নেই। উপরন্তু প্রকৃতিতে বিরাজমান ভাইরাস প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের (genetic mutation) মাধ্যমে অতিমারী সৃষ্টিকারী ভাইরাসে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তো আছেই। 

শেষ পর্যন্ত শুভ বুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সম্মিলনে সকল মানুষ একটি নিরাপদ পৃথিবী পাবে এটাই কাম্য। 


পঙক্তি আদৃতা বোস

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, 

ঢাকা-১১০০।

তথ্যসূত্র:

১। History of Smallpox | Smallpox

২। Safety of smallpox vaccine: questions and answers<sup>1</sup>

৩। Smallpox: Variolation (nih.gov)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button