Lifestyle

মাথা ব্যথা যখন মাইগ্রেন

আমাদের সবারই কখনো না কখনো সামান্য মাথা ব্যথা হয়। কিছু সময় বিশ্রাম নিলে বা একটা ব্যথানাশক ওষুধ খেলে সেসব ব্যথা চলেও যায়। কিন্তু এক ধরনের মাথা ব্যথা কাউকে কাউকে প্রায়ই অসুস্থ করে দেয়, কোনো কাজ করার সামর্থ্য থাকে না এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। হয়ত বুঝতে পারছেন কিসের কথা বলছি। 

আজকে চলুন মাইগ্রেন সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক। 

মাইগ্রেন এক ধরনের স্নায়বিক সমস্যা। বিশ্বে ৩য় সর্বাধিক প্রকট রোগ এটি। একই পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। শৈশবে অথবা মধ্যবয়সের শুরুর দিকে মাইগ্রেন এর লক্ষণ প্রথম প্রকাশ পেতে দেখা যায়। ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষদের মধ্যে এ রোগের উপস্থিতি বেশি। পুরুষদের তুলনায় মহিলারা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন। ব্যক্তিভেদে মাইগ্রেন বিভিন্ন রকম লক্ষণ তৈরি করে। যেমন:

  • বমি বমি ভাব
  • বমি
  • কথা বলায় অসাড়তা/ জিহবায় জড়তা – speaking difficulty
  • মাথা টন টন করছে এমন অনুভূতি
  • চলাফেরা করায় অসাড়তা
  • শব্দ বা আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা ইত্যাদি।

একই ব্যক্তির মধ্যে আবার মাইগ্রেনের লক্ষণ বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের। মাইগ্রেনের প্রধান লক্ষণ মাথা ব্যথা, যার এক বা দু’দিন আগে থেকেই অন্যান্য লক্ষণ শুরু হতে পারে। এ সময়কে বলা হয় প্রিড্রোম স্টেজ (Predrome Stage). এ পর্যায়ের লক্ষণগুলো হল: 

  • ক্ষুধা
  • অবসাদ
  • ক্লান্তি
  • ঘাড়ে ভার অনুভব হওয়া
  • বিরক্তিবোধ
  • অতিরিক্ত সক্রিয়তা (Hyperactivity) ইত্যাদি।

কারো কারো এর পরে এক ধরনের আবেশ তৈরি হয় যাকে বলা হয় ‘মাইগ্রেন উইথ অরা’ (Migrane with Aura). মাইগ্রেনে আক্রান্ত শতকরা ২৫ ভাগ রোগী Migrane with Aura তে আক্রান্ত হয়। এ পর্যায়ের কিছু লক্ষণ:

  • কথা বলতে সমস্যা হওয়া
  • মুখ, ঘাড় ও পায়ে টন টন করছে এমন অনুভূতি
  • আলোর ঝলকানি, বিভিন্ন আকৃতি, উজ্জ্বল আলোক বিন্দু দেখা
  • কিছু সময়ের জন্য দৃষ্টিশক্তি না থাকা 

এর পরের পর্যায়ে ব্যথা সবচেয়ে তীব্র হয়। এ পর্যায়কে বলা হয় ‘অ্যাটাক ফেজ’ (Attack Phase). কারো কারো ক্ষেত্রে Aura Phase-এই তীব্র ব্যথার অনুভূতি শুরু হতে পারে। এ পর্যায়ের লক্ষণগুলো হল:

  • আলো ও শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা
  • বমি ভাব
  • মাথা ঘোরা
  • মাথার যে কোন একদিকে তীব্র ব্যথা
  • মাথায় ভেতরে কিছু কাঁপছে এমন অনুভূতি হওয়া
  • বমি

এ পর্যায়ে সৃষ্ট লক্ষণগুলো কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। 

পর্যায়টি কেটে গেলে পোস্টড্রোম পর্যায় (Postdrome Phase) শুরু হয়। এ সময় সাধারণত মুড পরিবর্তন হয়। উচ্ছ্বসিত হওয়া থেকে ক্লান্তি অনুভব করা যেকোন ধরনের অনুভূতিই হতে পারে। অনেকের মাথা ব্যথাও থাকে সামান্য। আবার অনেকের মধ্যে এই পর্যায়টি দেখাই যায় না।      

শনাক্তকরণ: 

অসুস্থতার ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস ও লক্ষণ পর্যালোচনা করে চিকিৎসক মাইগ্রেনের সম্ভাবনা নিশ্চিত করেন। এরপর পরীক্ষা নিরীক্ষার (সিটি স্ক্যান, এম আর আই ইত্যাদি) মাধ্যমে অন্য কোনো রোগ (টিউমার, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি) না পাওয়া গেলে মাইগ্রেনের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হন এবং চিকিৎসা দেন। 

চিকিৎসা:

মাইগ্রেন থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব না। ওষুধ, পথ্য, জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে এর লক্ষণগুলোকে কিছুটা প্রশমিত করা যায় এবং ঘন ঘন হওয়াকে রোধ করা যায়। মাইগ্রেনের চিকিৎসা বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • রোগীর বয়স
  • মাইগ্রেনের কত দিন পর পর হয়
  • মাইগ্রেনের ধরন
  • মাইগ্রেনের তীব্রতা; যেমন- কতদিন পর পর হয়, কী কী লক্ষণ দেখা যায় এবং লক্ষণগুলোর তীব্রতা ও উপস্থিতিকাল
  • রোগীর অন্য কোনো অসুস্থতা ও ওষুধ গ্রহণ ইত্যাদি।

চিকিৎসা নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর সমন্বয়:

  • ব্যক্তিগত কিছু প্রতিবিধান
  • মানসিক চাপ কমানো
  • ‘মাইগ্রেন ট্রিগার’-এর সংস্পর্শে না আসা
  • ওষুধ গ্রহণ
  • হরমোনাল কারণে মাইগ্রেন হলে হরমোন থেরাপি
  • কাউন্সেলিং
  • মেডিটেশন ইত্যাদি।

ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে দীর্ঘদিন ফার্মেসি থেকে মাথা ব্যথা কমানোর ওষুধ কিনে খেলে অতিরিক্ত ওষুধ গ্রহণের ফলে মাথা ব্যথা (Medication Overuse Headache; MOH) হবার আশঙ্কা থাকে। মাইগ্রেনের রোগীদের মধ্যে এ রোগ প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে যথেচ্ছ ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ উচিৎ নয়। 


পঙক্তি আদৃতা বোস

২য় বর্ষ,

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, 

ঢাকা-১১০০।

তথ্যসূত্র:

১। https://www.healthline.com/health/migraine

২। Mayo Clinic. Migraine – Symptoms and causes.

৩। https://migraineresearchfoundation.org/about-migraine/migraine-facts/  

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button