Biotechnology

অপ্রয়োজনীয় ডিএনএ যখন প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়

প্রয়োজন ও অপ্রয়োজন এই দুটো ভালো-মন্দ ,সাদা-কালোর মতনই পাশাপাশি অবস্থান করে । বিশাল এই পৃথিবীতে প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন প্রয়োজন তেমনি অপ্রয়োজনীয় জিনিস ও অনেক সময় প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায় হোক সেটা শাক-সবজির উচ্ছিষ্ট অংশ যা দিয়ে জৈব সার তৈরি করে অথবা যে কোন জীব কোষের ক্ষুদ্র অনু  ডিএনএ এর প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় অংশ ।

আমরা সকলেই জানি, ডিএনএ হচ্ছে সকল জীবের গঠন ও বৈশিষ্ট্যের নীল নকশা যেখানে প্রাণীর আকার-আকৃতি আচরণ গঠন এবং প্রাণীর বৈশিষ্ট্য সবকিছু স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে । অল্প কথায় বলতে গেলে জিনগত তথ্য নকশা আকারে ডিএনএতে লেখা থাকে । জীবকোষের এই ক্ষুদ্রতম একক পার্থিব সকল জীবের যেমন মানুষ, হাতি-ঘোড়া এমনকি ব্যাকটেরিয়াতে ও পাওয়া যায় । জীব কোষে এর অবস্থান কোথায় তা মনে হয় আমার আর ভেঙেচুরে বলার প্রয়োজন নেই।

একটি কোষে ডিএনএ জানা এবং অজানা অনেক কাজ করে থাকে তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা করে থাকে তাহলে প্রোটিন তৈরি করা। আর এই প্রোটিনগুলো হিস্টোন এবং নন হিস্টোন এই দুই ভাগে বিভক্ত । যেগুলো ডিএনএ তে কোড আকারে অবস্থান করেl তবে প্রতিটি কোষের ডিএনএ তে উপস্থিত সমস্ত জিনগত তথ্য প্রকৃতপক্ষে প্রোটিনের কোড নয় অর্থাৎ প্রোটিন গুলো ডিএনএর ওই অংশে কোড আকারে অবস্থান করে নাl অকেজো বা কোষে কোন ফাংশনাল কাজ নেই ।

এখন আপনাদের মনে এই প্রশ্ন উঁকি ঝুঁকি করতে পারে যে এই অকেজো বা অপ্রয়োজনীয় ডিএনএর অংশ নিয়ে আমার এত মাথাব্যথা কেন? কারণ তো অবশ্যই আছে, বিনা কারণে কেউ তো আর শাক সবজির উচ্ছিষ্টাংশ জমিয়ে জৈব সার তৈরি করেন না।

ডিএনএর অপ্রয়োজনীয় ননকোডিং অংশকে সহজ-সরল ভাষায় জাঙ্ক ডিএনএ বলে, যা আমাদের প্রায় সকলেরই জানাl সবচেয়ে অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে যে, মানুষের জিনোমে ডিএনএ প্রায় 92% অংশই হচ্ছে জাঙ্ক ডিএনএ, যেখানে ব্যাকটেরিয়ায় জেনেটিক উপাদানের মাত্র 2% জাঙ্ক ডিএনএ থাকেl এটি কোষে নিউক্লিয়াস এর ভিতরে ক্রোমোজোম গুলোকে সঠিকভাবে বান্ডেল আকারে প্যাক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে, যা কোষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়l আর মজার বিষয় হচ্ছে যে ডিএনএ এর কিছু অংশ ননকোডিং আরএনএ উপাদান যেমন, টি-আরএনএ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়l

যাইহোক, একদল গবেষক প্রমাণ করেছেন যে “জাঙ্ক ডিএনএ কিছু কার্যকরী ক্রিয়াকলাপ সরবরাহ করতে পারে।“ ২০১২ সালে, এনকোড(ENCODE) প্রকল্প নামে একটি  গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছিলেন যে, মানুষের জিনোমে প্রায় তিন চতুর্থাংশ ননকোডিং ডিএনএ প্রতিলিপি রয়েছে এবং জিনোমের প্রায় 50% বংশগত নিয়ন্ত্রণে জড়িত প্রোটিন যেমন, ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে ।এ জাতীয় ‘জাঙ্ক ডিএনএ’ এর উদাহরণ হল পেরিকেন্ট্রোম্যাট্রিক স্যাটেলাইট ডিএনএ, যা সমস্ত ক্রোমোসোমে পাওয়া যায় ।

এই পেরিকেনট্রোম্রিক স্যাটেলাইট ডিএনএতে জেনেটিক কোডের একটি খুব সাধারণ, পুনরাবৃত্তিক ক্রম থাকে যা জিনোমকে কম স্থিতিশীল এবং ক্ষতিকর রোগের জন্য আরও সংবেদনশীল করে তোলে। মোটামুটি আজ অবধি বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে এই “জাঙ্ক” বা “স্বার্থপর” ডিএনএ কোনও আসল উদ্দেশ্য কাজে লাগায় না। নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, প্রাণীকোষের নিউক্লিয়াসে, নির্দিষ্ট ডিএনএ বাইন্ডিং প্রোটিনগুলি বিভিন্ন ক্রোমোসোমে একাধিক পেরিকেন্ট্রোম্যাট্রিক স্যাটেলাইট ডিএনএ অনুক্রমগুলিকে সংযুক্ত করে ক্রোমোজোমকে একসাথে আটকায়। প্রকৃতপক্ষে, যদি এই প্রোটিনগুলি পরীক্ষাগারে ইঁদুর এবং মৌমাছির কোষ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, তবে ক্রোমোজোমগুলি একসাথে ক্লাস্টার করা যায় না। তার পরিবর্তে, ক্রোমোজোমগুলি ‘দূরে ভাসে’ এবং নিউক্লিয়াসের ঝিল্লি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই ঘটনাগুলি জেনেটিক তথ্যের ক্ষতি করে, যার ফলে কোষটি মারা যায় বা টিউমার তৈরি করতে পারে। তাই ‘জাঙ্ক ডিএনএ’ প্রজাতি জুড়ে মৌলিক সেলুলার প্রক্রিয়াগুলিতে অংশ নিয়েছে বলে মনে হয়।

আগেই বলে রাখি “প্রোটিনের এক বা একাধিক খাঁজ বা বাঁধাই সাইট রয়েছে, তাই এটি একাধিক ক্রোমোজোমের সাথে বাঁধতে পারে এবং সেগুলিকে এক জায়গায় প্যাকেজ করতে পারে, পৃথক ক্রোমোজোমগুলিকে নিউক্লিয়াস থেকে ভাসমান থেকে আটকাতে পারে।” গবেষকরা একটি মডেল জীব, মৌমাছির কোষ থেকে  D1 প্রোটিন সরিয়েছেন এবং লক্ষ্য করেছে যে জীবাণু কোষগুলি – যে কোষগুলি শেষ পর্যন্ত শুক্রাণু বা ডিমের মধ্যে বিকশিত হয় সেগুলো মারা যাচ্ছে। আরও বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে মৃত কোষগুলি নিউক্লিয়াসের বাইরে জিনোমের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত মাইক্রো নিউক্লিয়াস বা ক্ষুদ্র  কুঁড়ি গঠন করে। নিউক্লিয়াসে পুরো জিনোমকে আবদ্ধ না করে কোষগুলি টিকে থাকতে পারে না। D1 প্রোটিনটি নিউক্লিয়াসে সমস্ত ক্রোমোজোমগুলিকে একসাথে টানতে স্যাটেলাইট ডিএনএ-র সাথে আবদ্ধ করে। যদি D1 প্রোটিন স্যাটেলাইট ডিএনএ দখল করতে না পারে তবে কোষ একটি সম্পূর্ণ নিউক্লিয়াস গঠনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত মারা যায়। দলটি ইঁদুরের কোষ ব্যবহার করে একই রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিল এবং একই ফলাফল পেয়েছিল: যখন তারা একটি প্রোটিন সরিয়ে দেয় যা সাধারণত ইঁদুরের স্যাটেলাইট ডিএনএ-র সাথে আবদ্ধ হয়, তখন কোষগুলি আবার মাইক্রো নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং যা বেঁচে থাকে না। 

UT researchers take on honey bee decline - News - Austin American-Statesman  - Austin, TX
Lab for experimenting on rats opens in Guangdong - Global Times

উভয়  মৌমাছি এবং ইঁদুরের কোষের অনুরূপ অনুসন্ধানগুলি যে স্যাটেলাইট ডিএনএ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়, কেবলমাত্র মডেল জীবগুলিতেই নয়, বরং প্রয়োজন সকল প্রজাতি জুড়ে যেগুলি ডিএনএকে  নিউক্লিয়াসের সঙ্গে একসাথে বেঁধে রাখে বা আবদ্ধ অবস্থায় রাখে করে – মানুষ সহ ।


নাম: নাবিলা রব

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ

References:

1. https://www.sciencedaily.com/releases/2018/04/180411131659.html

2. https://elifesciences.org/articles/34122 

3. https://www.scientificamerican.com/article/hidden-treasures-in-junk-dna/

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button