Medical Science

নীরব ঘাতক হার্ট অ্যাটাক

আমাদের আশে পাশে  হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগে আক্রান্ত অনেক মানুষই আছেন। হয়তো আমাদের পরিবারে বা আমাদের আত্মীয় বা পরিচিত কেউ। নানা দুশ্চিন্তা বা নানা কারণেও অনেক অঘটন ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু আমরা তাও অনেক সময় সঠিকভাবে জানিনা এর আসল কারণ। হার্ট অ্যাটাক সাধারণত  মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (এমআই) নামেও পরিচিত।  যখন রক্তের প্রবাহ হ্রাস পায় বা হৃৎপিণ্ডের কোনও অংশে বন্ধ হয়ে যায় তখন হৃৎপিণ্ডের পেশীগুলির ক্ষতি হয়। সাধারণ লক্ষণ হল- বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি যা কাঁধ, বাহু, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে যে কোন স্থানে হতে পারে। হার্ট অ্যাটাক হল জীবন- সংকটাপন্ন অবস্থা  যা হৃৎপিণ্ডের পেশীতে রক্ত ​​প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া যা  হৃৎপিণ্ডের টিস্যুর ক্ষতি করে। এটি সাধারণত করোনারি ধমনীতে এক বা একাধিক ব্লকের বাধার ফলে হয়ে থাকে। ফলক তৈরির ফলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চর্বি, কোলেস্টেরল এবং সেলুলার বর্জ্য পণ্য দ্বারা তৈরি হয়ে থাকে। বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাক করোনারি আর্টারি রোগের ফলস্বরূপ যা এথেরোস্ক্লেরোসিস বা ধমনী শক্ত করা নামেও পরিচিত। এমন একটি অবস্থা যা সময়ের সাথে সাথে ফ্যাটি ক্যালক্লিফিক প্লাকগুলি সহ করোনারি ধমনিকে আটকে দেয়। হার্ট অ্যাটাকের জন্য সাধারণত ট্রিগার হল রক্ত ​​জমাট বাঁধা যা করোনারি ধমনির মাধ্যমে রক্তের প্রবাহকে বাধা দেয়।  রক্ত ​​জমাট বাঁধা শুরু হলে ফলকের উপরে তা সংকীর্ণতায় রক্ত ​​প্রবাহকে বাধাঁ দেয়। এখন চিকিৎসকরা মনে করেন যে কম গুরুতর ফলকগুলি সবচেয়ে বেশি হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী।  এটি মাইল্ডার ব্লকেজগুলির ফাটল ধরায় এবং তারপরে রক্ত ​​জমাট বাঁধার কারণ হয়ে দাড়াঁয়। হার্ট অ্যাটাক হয় যখন হৃৎপিণ্ডে রক্ত ​​প্রবাহ অবরুদ্ধ থাকে। হৃৎপিণ্ডে কখনও কখনও ফলক ফেটে যায় এবং এমন একটি জমাট তৈরি করে যা হার্টের পেশীগুলির কিছু অংশ ক্ষতি করতে বা ধ্বংস করতে পারে। 

হার্ট অ্যাটাক করোনারি ধমনী স্প্যামের কারণেও হতে পারে। যেখানে হার্টের ধমনী সাময়িকভাবে সংকুচিত হয়, যদিও এটি খুবই বিরল কারণ হিসাবে গণ্য করা হয়। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে হার্ট অ্যাটাকে বিবর্তনে প্রদাহও ভূমিকা রাখে। 

প্রায়শই হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হল বুকে ব্যথা। মাঝে মাঝে ব্যথা বুকের  মাঝখানে বা বাম দিকে ঘটে এবং কয়েক মিনিটেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী থাকে।  অন্যান্য লক্ষণগুলির মধ্যে 

-শ্বাসকষ্ট

-বমি বমি ভাব

-অজ্ঞান বোধ হওয়া 

– ঠান্ডা ঘাম বা ক্লান্তি  অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

প্রায় ৩০% লোকের অ্যাটিকাল লক্ষণ রয়েছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রায়শই বুকে ব্যথা ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক দেখা যায়। পরিবর্তে ঘাড়ে ব্যথা, বাহুতে ব্যথা বা ক্লান্তি অনুভব করেন। ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৫% মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে যার লক্ষণগুলো অল্প বা ইতিহাস নেই। হার্ট অ্যাটাকে হৃদস্পন্দন একটি অনিয়মিত হার্টবিট, কার্ডিওজেনিক শক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ হতে পারে। হার্ট অ্যাটাক হওয়া সমস্ত ব্যক্তিরই লক্ষণ বা তীব্রতা একই নয়। কিছু লোকের হালকা ব্যথা হয় বা আরও কারো ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা হয়। কিছু মানুষের কোনও লক্ষণও দেখা যায় না। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। কিছু হার্ট অ্যাটাক হঠাৎ করে আঘাত হানে তবে অনেকের মধ্যে কয়েক ঘন্টা, দিন বা সপ্তাহ আগে সতর্কতার লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দেয়।  প্রথম দিকের সতর্কতাটি বারবার বুকের ব্যথা বা চাপ (এনজাইনা) হতে পারে যা ক্রিয়াকলাপের দ্বারা ট্রিগার এবং বিশ্রামের মাধ্যমে মুক্তি পায়। হৃদপিণ্ডে রক্ত ​​প্রবাহ অস্থায়ী হ্রাসের ফলে এনজাইনা হয়। এনজিনা হল হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক সতর্কতা সংকেত।  হার্ট অ্যাটাকের সাথে রক্তের প্রবাহ লক্ষণীয় ভাবে হ্রাস বা সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ হয়ে যায়। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ছাড়াই পেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সমস্ত হার্ট অ্যাটাকের প্রায় ২৫% কোনও সতর্কতা চিহ্ন ছাড়াই ঘটে। এগুলি কখনও কখনও “সাইলেন্ট ইস্কেমিয়া” নামেও পরিচিত। রক্তে প্রবাহিত হতে বিক্ষিপ্ত বাধা দেওয়ায়  যা অজানা কারণে ব্যথা মুক্ত থাকে যদিও তারা হার্টের টিস্যুগুলিকে ক্ষতি করতে পারে অবস্থাটি ইসিজি (ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম) পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করা হয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়শই নিঃশব্দে ইস্কেমিয়া হয়। 

যদি কারো উচ্চ রক্তচাপ থাকে তার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির বেশি। বয়সের উপর নির্ভর করে সাধারণ রক্তচাপটি ১২০/৮০ মিমি এইচজি (পারদ এর মিলিমিটার) এর নীচে থাকে। সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে হার্টের সমস্যাগুলির ঝুঁকি বাড়তে থাকে। উচ্চ রক্তচাপ ধমনীর ক্ষতি করে এবং ফলকের তৈরিতে ত্বরান্বিত করে। উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল তীব্র মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের ঝুঁকি তৈরি করে। কোলেস্টেরল মাত্রা কমলে বা নিয়ন্ত্রণে থাকলে এই ঝুঁকি মোকাবিলায়  সক্ষম হয়।

উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। ট্রাইগ্লিসারাইডগুলি এক ধরণের ফ্যাট যা ধমনীগুলি আটকে দেয়। যে খাবার গ্রহণ করা হয় তা থেকে ট্রাইগ্লিসারাইডগুলি রক্তে সাধারণত চর্বিযুক্ত কোষগুলিতেদেহে সংরক্ষণ না হওয়া অবধি ভ্রমণ করে। তবে কিছু ট্রাইগ্লিসারাইড ধমনীতে থাকতে পারে এবং ফলক তৈরিতে অবদান রাখতে পারে। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা রক্তে শর্করার বা গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায়। উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা রক্তনালীগুলিকে ক্ষতি করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত করোনারি ধমনী রোগের কারণ হতে পারে। এটি স্বাস্থ্য জনিত গুরুতর সমস্যা । যা কিছু লোকের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে। যদি কারো ওজন বেশি হয় তখন হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। স্থূলত্ব বিভিন্ন অবস্থার সাথে যুক্ত যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। করোনারি ধমনীতে সম্পূর্ণ বা আংশিক বাধা হওয়ায় হার্ট অ্যাটাকের প্রধান কারণ। 

হার্ট অ্যাটাকের আরেকটি কারণ হল করোনারি ধমনীর এক ঝাঁকুনি যা হৃৎপিণ্ডের পেশির অংশে রক্ত ​​প্রবাহকে বন্ধ করে দেয়। তামাক এবং মাত্রারিক্ত ওষুধের ব্যবহারের ফল স্বরুপ।এছাড়াও  COVID-19 এর সংক্রমণ আপনার হার্টকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

যদি পারিবারিকভাবে হৃদরোগের ইতিহাস থাকে তবে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি ৫৫  বছর বয়সের আগে কারো হৃদরোগ হওয়ার পারিবারিক ইতিহাস থাকে তাদের পরিবারের বাকি সদস্যদের বেশি ঝুঁকি রয়েছে।  যাদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বয়সের আগে হৃদরোগের বিকাশ হয় তাদের ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে কিছু কারণ ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। যেমন-

-চাপ বা দুশ্চিন্তা 

-অনুশীলনের অভাব

– অতিরিক্ত ওষুধের ব্যবহার 

-গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস। 

বিশ্বব্যাপী ২০১৫ সালে প্রায় ১৫.৯ মিলিয়ন মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছিলো।   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়ন লোক হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে থাকে। উন্নত বিশ্বে যাদের স্টেমি হয়েছে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১০%। একটি নির্দিষ্ট বয়সের জন্য এমআই(Miochardial Infetion) এর হার ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী হ্রাস পেয়েছে। হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত মানুষরা এক চতুর্থাংশ চিকিৎসা ছাড়ায় মৃত্যুবরণ করেন এবং অনেকেই নানা জটিলতায় ভোগেন। যেমন- -স্ট্রোক

-অবিরাম হার্ট অ্যারিটিমিয়াস (অনিয়মিত হার্ট বিটস)

-হার্টের কার্যকলাপে বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে

-রক্তের জমাট বাঁধা  ইত্যাদি 

৪৫ বা ৫৫ বছর পুরুষ ও মহিলাদের  মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা  কম বেশি সবার থাকে। বিপাকীয় সিন্ড্রোমের ফলেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। স্থূলত্ব, উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ রক্তে সুগার থাকলে এই সিনড্রোম হয়। বিপাকীয় সিনড্রোম হৃদরোগের আশঙ্কা দ্বিগুণ করে তোলে। নিঃশব্দ মায়োকার্ডিয়াল ইনফারাকশনগুলি কোনও লক্ষণ ছাড়াই ঘটে। এএই ধরনের নীরব মায়োকার্ডিয়াল ইনফারাকশনগুলি ২২ থেকে ৬৪% মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। প্রবীণদের ক্ষেত্রে এটি খুবই সাধারণ। ডায়াবেটিস মেলিটাস আক্রান্তদের ও হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের লক্ষণগুলির জন্য এ নিঃশব্দ হার্ট অ্যাটাক লক্ষণ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয়। 

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো হল- 

-বুকে ব্যথা 

– শ্বাসকষ্ট

– বুক, পিঠ, চোয়াল এবং উপরের দেহের অন্যান্য স্থান   ব্যথা যা কয়েক মিনিটেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়। 

-নিঃশ্বাসের দুর্বলতা

-ঘাম

-বমি বমি ভাব

-উদ্বেগ

-কাশি

-মাথা ঘোরা 

– হালকা মাথা ব্যথা

হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করার জন্য চিকিৎসক  হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করবে এবং রক্তচাপও পরীক্ষা করে থাকেন। হৃদস্পন্দনের বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপ পরিমাপ করার জন্য একটি ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (EKG) করা হয়ে থাকে। হার্টের ক্ষতির সাথে জড়িত প্রোটিনগুলি পরীক্ষা করার জন্য রক্ত ​​পরীক্ষাও ব্যবহার করা যেতে পারে যেমন – ট্রোপোনিন। অন্যান্য পরীক্ষাগুলো হল- 

১. স্ট্রেস টেস্ট

২.  এনজিওগ্রাম 

৩. ইকোকার্ডিওগ্রাম

মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কেশন প্রতিরোধের জন্য জীবনধারা এবং ক্রিয়াকলাপের সুপারিশগুলির মধ্যে একটি বৃহৎ  ক্রসওভার রয়েছে এবং প্রাথমিক মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের পরে যেগুলি গৌণ প্রতিরোধ হিসাবে গণ্য করা হয়। 


আফিয়া ইমরাদ তাহাসিন

বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড বায়োটেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট 

ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি চিটাগং 

Reference –

  1. https://link.researcher-app.com/n9XR
  2. https://link.researcher-app.com/KRPt
  3. https://youtu.be/T_b9U5gn_Zk

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button