Medical Science

চোখ দেখেই বুঝে নিন নিজের ও পছন্দের মানুষটির ব্যক্তিত্ব

চোখ হলো মানুষের মনের জানালা। চোখ দেখেই বুঝে ফেলা যায় পছন্দের মানুষটি কী বলতে চাচ্ছে। আচ্ছা, চোখের গঠন কিরকম? চোখের রং কেনোইবা আলাদা আলদা হয়? কারো চোখ কাজল কালো, তো কারো সবুজ, কারো বাদামী আবার কারো নীলাভ। পৃথিবীর কোথায় চোখের রং কিরকম? চোখের রং কি পরিবর্তিত হতে পারে? কিভাবে বুঝবেন প্রিয় মানুষটির ব্যক্তিত্ব? এসব যদি আপনার মনের প্রশ্ন হয় তবে এই লেখাটি আপনারই জন্য। চলুন প্রথমেই জেনে নেয়া যাক চোখের গঠন সম্পর্কে।

চোখের গঠনঃ 

চোখের কোটরের মধ্যে অবস্থিত সামনে পিছনে খানিকটা চ্যাপ্টা ও গোলাকার অংশটির নাম অক্ষিগোলক। এটি চোখের কোটরে পেশীর সাহায্যে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ঘুরতে পারে।

অক্ষিগোলকের সামনে অস্বচ্ছ, সাদা, তন্তুময় আবরণীটির নাম শ্বেতমন্ডল। এটি চোখের আকৃতি ঠিক রাখে এবং বাইরের অনিষ্ট থেকে চোখকে রক্ষা করে। এর সামনের স্বচ্ছ, উত্তল অংশটি হলো কর্নিয়া। শ্বেতমন্ডলের ভিতরের গায়ে কালো ঝিল্লির আবরণীটির নাম কৃষ্ণমন্ডল। এটি চোখের ভিতরে আলোর প্রতিফলন রোধ করে।

কর্নিয়ার পেছনে  অবস্থিত অস্বচ্ছ পর্দাটির নাম আইরিস। এটি স্থান, লোক ও ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন রঙ এর হতে পারে। যেমন: বাদামী, সবুজ, কালো ইত্যাদি। কর্নিয়ার মাঝে যে গোলাকার ছিদ্রপথ থাকে তাকে তারারন্ধ্র বলে। মাংসপেশির সংকোচন প্রসারণে এর আকার পরিবর্তন হয়। ফলে চোখে কতটুকু আলো প্রবেশ করবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

আইরিশের ঠিক পিছনেই স্বচ্ছ জেলির ন্যায় পদার্থ দিয়ে তৈরি উত্তল লেন্স থাকে। পেশির সংকোচন প্রসারণ ঠিক করে দেয় আপনি কাছের বস্তুতে ফোকাস করবেন নাকি দূরের বস্তুতে। লেন্সের পিছনে এবং অক্ষিগোলকের ভিতরের পৃষ্ঠে উপরের অংশে আলোক সংবেদী গোলাপী আবরণীকে রেটিনা বলে। এখানেই দর্শন অনুভূতির সৃষ্টি হয় এবং তা রড ও কোন স্নায়ুতন্তুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রেরিত হয়।

কর্নিয়া ও লেন্সের মধ্যবর্তী স্থানে স্বচ্ছ, লবণাক্ত ও জলীয় অ্যাকুয়াস হিউমার এবং লেন্স ও রেটিনার মধ্যবর্তী স্থানে জেলির মতো ভিট্রিয়াস হিউমার দ্বারা পূর্ণ থাকে।

কেন মানুষের চোখের রং ভিন্ন ভিন্ন?

মূলত আইরিশের ভিন্ন ভিন্ন রঙের কারণেই মানুষের চোখের রং ভিন্ন ভিন্ন হয়। আইরিস গঠিত হয় সংযোজী টিস্যু, একটি পাতলা মাংসপেশি এবং কিছু সংখ্যক পিগমেন্ট নিয়ে। আইরিসের যে কোষ গুলো পিগমেন্ট তৈরি করে তার নাম মেলানোসাইট। মেলানোসাইট আমাদের ত্বক ও চুলের রঙও নিয়ন্ত্রণ করে। 

আপনার চোখে কতটা পিগমেন্ট আছে তার উপর নির্ভর করে আপনার চোখের রং কি হবে। আপনার চোখে যত বেশি পিগমেন্ট থাকবে আপনার চোখের রং তত গাঢ় হবে। যেমন: বাদামী বা কালো। আর আপনার চোখে যত কম পিগমেন্ট থাকবে আপনার চোখের রং তত হালকা হবে। যেমন: হ্যাজেল, ধূসর, সবুজ বা নীল।

আইরিসে খুব সামান্য পরিমাণে পিগমেন্ট থাকলে চোখের রং হয় নীল। এর থেকে একটু বেশি পরিমাণে পিগমেন্ট থাকলে চোখের রং হয় সবুজ বা হ্যাজেল। হ্যাজেল হলো বাদামী ও সবুজ বর্ণের মিশ্রণ। আর এর চেয়েও বেশি পরিমাণে পিগমেন্ট থাকলে চোখের রং হয় বাদামী এবং সর্বোচ্চ পরিমাণে পিগমেন্ট থাকলে চোখের রং হয় বাদামী বা কালো।

পৃথিবীর কোথায় কী ধরনের চোখ দেখতে পাওয়া যায়?

পৃথিবীতে শতকরা কতভাগ জনসংখ্যার চোখের রং কিরকম সে সম্পর্কে ‘ওয়াল্ড অ্যাটলাস’ একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।

র‍্যাঙ্কিংচোখের বর্ণবিশ্ব জনসংখ্যার আনুমানিক শতাংশ
১.বাদামী৫৫% থেকে ৭৯%
২.নীল৮% থেকে ১০%
৩.হ্যাজেল৫%
৪.অ্যাম্বার৫%
৫.সবুজ২%
৬.ধূসর<১%
৭.লাল/বেগুনী<১%
৮.হেটারোক্রোমিয়া<১%

গাঢ় বাদামী বর্ণের চোখের মানুষ সব থেকে বেশি বসবাস করে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা অঞ্চলে। অপরদিকে হালকা বাদামি রঙের চোখ দেখা যায় ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া ও আমেরিকা জুড়ে। ফিনল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষের চোখের রং নীল। আবার ইউরোপের উত্তর, পশ্চিম ও মাঝ প্রান্তের মানুষের চোখের রং সবুজ। ধূসর বর্ণের চোখ দেখা যায় উত্তর ও পূর্ব ইউরোপে।

চোখের রং কিভাবে পরিবর্তিত হতে পারে?

কার চোখের রং কী হবে বা কতটুকু পিগমেন্ট থাকবে তা জিনগতভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। তবুও স্থান, কাল ও বয়সভেদে চোখের রং পরিবর্তিত হয়। শিশু জন্মের পর আইরিসে পিগমেন্ট থাকেনা বললেই চলে। তখন তার চোখের রং হয় নীল। ধীরে ধীরে পিগমেন্টের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং ২-৩ বছর পর চূড়ান্ত রূপ বা রং ধারণ করে। খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যের অবস্থা, বিভিন্ন রোগ, আবেগ, পরিবেশ এবং সূর্যালোকও চোখের রং পরিবর্তনে বেশ বড় ভূমিকা পালন করে।

কৃত্রিম উপায়ে চোখের রং পরিবর্তনেও মানুষ প্রচুর আগ্রহী। সমীক্ষায় দেখা গেছে শতকরা ৬০ ভাগ মানুষই তাদের চোখের রং পরিবর্তন করতে চান। তাদের মধ্যে শতকরা ২৭ ভাগ মানুষ সবুজ এবং শতকরা ১৮ ভাগ মানুষ নীল চোখ চান।

কোস্টারিকায় লেজার ট্রিটমেন্ট দিয়ে চোখের রং নীল করা হয়। তবে এটি বেশ বিপদজনক এবং সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। অনেকেই সাময়িক চোখের রং পরিবর্তনে কন্টাক লেন্স ব্যবহার করে থাকেন। এতেও রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং চোখের স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা।

চোখ দেখে কিভাবে ব্যক্তিত্ব বোঝা যায়?

চোখ আমাদের সম্পর্কে অনেক তথ্য দেয়। ওবেরো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ৪২৮টি আলাদা ছোট ছোট দলের উপর গবেষণা চালিয়ে মতামত দিয়েছেন, “আমাদের চোখ সত্যিই আমাদের মনের জানালা।” আমাদের চোখ আমাদের সম্পর্কে কী বলে চলুন জেনে নিই।

একদম কালো বর্ণের চোখ বলতে গেলে পৃথিবীতে বিরল। তারা জন্মগত ভাবেই নেতৃত্বের গুণাবলি সম্পন্ন। পাশাপাশি তারা উৎসাহী ও আশাবাদী। তাদের ত্রুটি বলতে তারা বন্ধুত্ব গাঢ় করতে বা সম্পর্কে জড়াতে অনিচ্ছুক।

বাদামী বর্ণের চোখধারীরা সব সময় হাসি-ঠাট্টা পছন্দ করে, নম্রভদ্র, স্বাধীনতা পছন্দ করে, প্রচুর অলস এবং বন্ধুত্ব গড়তে ভালোবাসে। তারা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী তবুও নিজেকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেনা। তারা তাদের সঙ্গীকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসতে জানে। তবে তাদের ত্রুটি হলো তারা তাদের প্রিয় মানুষটির কাছে অসহায় এবং তার কাছে গুরুত্ব পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে।

হ্যাজেল বর্ণের চোখধারীরা মার্জিত ও সুরুচি সম্পন্ন। হ্যাজেল হলো বাদামী ধূসর বর্ণের মিশ্রণ। তারা সবসময় পজিটিভ, হাস্যোজ্জ্বল ও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। যেকোনো পরিস্থিতির সাথে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। তাদের অসম্পূর্ণতা হলো তারা অল্পতেই রাগান্বিত স্বভাবের এবং তাদের কোনো সম্পর্কই খুব বেশি দিন টেকে না যদিনা সে একদম মনের মত কাউকে খুঁজে পায়।

ধূসর চোখধারীরা জ্ঞানী ও শান্ত স্বভাবের। তারা রাশভারী এবং সব কিছুতেই বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাদের দোষ হলো তারা দ্বিমুখী স্বভাবের তাই তাদের বিশ্বাস করা খুব কঠিন।

সবুজ চোখের লোকেরা দৃঢ় ও সাবধানী স্বভাবের। তারা চালাক, তারুণ্যময় এবং উদ্যমী। বেশিরভাগ মানুষের কাছে এরা আকর্ষনীয় ও সমাদৃত হয়। তাদের খারাপ দিকটি হলো তারা খুব সহজেই ঈর্ষান্বিত বোধ করে।

আপনার চোখের রং যদি নীল হয়ে থাকে তবে আপনি শান্ত, স্মার্ট, দয়ালু এবং তারুণ্যময়। আপনি নিজের সম্পর্কে খুব বেশি প্রকাশ করেন না। আপনি সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখেন। আপনার একাগ্রতা সত্যিই অসাধারণ। আপনার অসম্পূর্ণতা হলো অতি অনুসন্ধানী ও হুশিয়ারি স্বভাব প্রায়শই আপনাকে আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী থেকে দূরে রাখে। 

আপনার ব্যাক্তিত্ব যাই হোকনা কেন চোখ অত্যন্ত মূল্যবান একটি অঙ্গ। চোখ শরীর, স্বাস্থ্য ও মনের সফলতার চাবিকাঠি। চোখের যত্ন নিন। বাইরে গেলে রোদ চশমা ব্যবহার করুন। সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিই আপনার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবে।


মো: আরিফ ফয়সাল লাবিব

শিক্ষার্থী, 

ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://www.medicalnewstoday.com/articles/319767#Pigment-makes-eyes-look-dark 
  2. https://www.kalerkantho.com/print-edition/education/2019/07/07/788247
  3. https://www.vsp.com/eyewear-wellness/eye-health/eye-color
  4. https://www.allaboutvision.com/conditions/eye-color-brown.htm
  5. https://www.worldatlas.com/articles/which-eye-color-is-the-most-common-in-the-world.html
  6. https://www.google.com/amp/s/www.scoopwhoop.com/amp/inothernews/eye-colour-personality/
  7. https://www.2020onsite.com/blog/6-reasons-your-eyes-might-change-color
  8. https://zeenews.india.com/bengali/technology/laser-technology-to-turn-brown-eyes-into-blue-permanently_126160.html
  9. https://www.essilorusa.com/newsroom/surprising-personality-traits-revealed-by-your-eye-color

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button