Lifestyle

অতিরিক্ত সচেতনতা কোন রোগের লক্ষণ নয় তো?

মানুষ সংবেদনশীল প্রাণী। নিজের আবেগ বুদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মানুষের আছে। কিন্তু, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থাৎ খুব অল্প সংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। মাঝে মাঝে এইসব ব্যতিক্রমী মানুষদের অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার এ আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। যা ওসিডি হিসেবেও পরিচিত। ওসিডি এমন একটি ব্যাধি যার মধ্যে লোকেরা বারবার অযাচিত চিন্তাভাবনা, ধারণা বা সংবেদনগুলো (আবেশ) বা বারবার কিছু করার তাগিদ দেয় (বাধ্যতামূলক)। ওসিডি কোন নেতিবাচক চিন্তাভাবনা বা দৈন্দিক কোন অভ্যাস নয়। এটি মূলত কোন জিনিসের ভাল বা খারাপ দুটোই বিবেচনা করা হয়। আপনি কোন জিনিস অপছন্দ করলে সেটিকে বার বার এড়িয়ে চলা বা অন্য কেউ সেই কাজ করলে রেগে যাওয়া প্রভৃতি বুঝায়। ওসিডির একটি বাধ্যতামূলক অভ্যাস হল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে চাওয়া। নোংরা হতে পারে এমন কিছুর সংস্পর্শে আসলে বার বার হাত ধোয়া উচিত বলে মনে করা। ওসিডি একটি মানসিক ব্যাধি। এটি একটি উদ্বেগ জনিত ব্যাধি যা জনসংখ্যার প্রায় দুই থেকে তিন শতাংশ (৫০০০০০০ এর বেশি অস্ট্রেলিয়ান)  মানুষকে প্রভাবিত করে। এটি সাধারণত শৈশবের শেষে বা কৈশোরের শুরুর দিকে দেখা যায়। ওসিডির লোকেরা পুনরাবৃত্তি এবং অবিচলিত চিন্তাভাবনা, চিত্র বা আবেগগুলি অনুপ্রবেশকারী এবং অযাচিতের অভিজ্ঞতা লাভ করে। তারা পুনরাবৃত্তিমূলক এবং আচার-আচরণমূলক ক্রিয়াও সম্পাদন করে যা অতিরিক্ত সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টদায়ক।  এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা তাদের আবেশ ও বাধ্যবাধকতার অযৌক্তিক ও অত্যাধিক প্রকৃতির সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। তবে তারা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে বা তাদের বাধ্যবাধকতা প্রতিরোধ করতে অক্ষম বোধ করেন। 

যদি কোন ব্যক্তি বার বার কিছু নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা করলে (যা অবসেশন নামেও পরিচিত) বা কিছুটা নিয়মিত রুটিন মেনে করা প্রয়োজন বোধ করলে বা বাধ্যতামূলক ভাবলে তা কিছুটা বিপর্যয় সৃষ্টি করে কিংবা সাধারণ ক্রিয়াকলাপে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে । ব্যক্তি বেশিরভাগ সময় ধরে ভাবনা বা ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। সাধারণ বাধ্যবাধকতাগুলোর মধ্যে অন্যতম –

  • হাত ধোঁয়া 
  • জিনিস গণনা করা
  • দরজা তালাবদ্ধ কিনা পরীক্ষা করা অন্তর্ভুক্ত 

ওসিডি কখনও কখনও প্রায় ২.৩% লোককে প্রভাবিত করে। ৩৫ বছর বয়সের পরে লক্ষণগুলো শুরু হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রায় অর্ধেক লোকের ক্ষেত্রে ২০ বছরের আগে সমস্যা দেখা দেয়। এতে পুরুষ ও স্ত্রীলোকেরা সমানভাবে প্রভাবিত হয়। অবসেসিভ বাধ্যতামূলক শব্দটি ওসিডির সাথে সম্পর্কিত না হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা হয়। ওসিডির আসল কারণ এখনো পর্যন্ত অজানা। পরিবেশগত ও জিনগত উভয় কারণেই এটি হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে শিশু নির্যাতনের ইতিহাস বা অন্যান্য চাপ অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন ধরনের ওষুধ রোগীদের ক্ষেত্রে খাঁটি ওসিডি প্ররোচিত করতে পারে যাদের আগে কখনও লক্ষণ ছিল না। ডিএসএম-৫ (২০১৩) এ ওসিডি সম্পর্কে বিশেষত ড্রাগ প্ররোচিত ওসিডি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শৈশবে যাদের ওসিডি বিকাশ ঘটে তাদের অনেকবেশি শক্তিশালী পারিবারিক যোগসূত্র রয়েছে। সেক্ষেত্রে ওসিডি পরবর্তীকালে যৌবনে বিকশিত হয়। জেনেটিক কারণগুলি ডিসঅর্ডার শনাক্তকরণকারী শিশুদের মধ্যে ওসিডি লক্ষণগুলির পরিবর্তনশীলতার ৪৫-৬৫% অবদান রাখে। ২০০৭ সালে একটি গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে ওসিডি যারা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকে তাদের ঝুঁকি বেশি। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপযুক্ত রোগ নির্ণয় পেতে ১৭ বছর সময় লাগে। ওসিডি চার প্রকার। যথা-

  • দূষণ 
  • পরিপূর্ণতা
  • সন্দেহ/ক্ষতি
  • নিষিদ্ধ চিন্তা

তবে আরও বিভিন্ন রকম ওসিডি রয়েছে। তা হলো-

  • স্টারিং ( Staring OCD)
  • সম্পর্ক ওসিডি (Relationship OCD)
  • অস্তিত্বের ওসিডি ( Existential OCD)

বিশ্ব পরিবর্তনের সাথে সাথে ওসিডির বিভিন্ন প্রকাশ ঘটে। বিশ্ব যখন Covid-19  এ রুপান্তরিত হয়ে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার মুভমেন্টের মতো বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন তখনের পরিস্থিতির সাথে সমস্ত মানুষ ঘরবন্দী হওয়ায় ওসিডি উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।

লক্ষণ- 

  • ময়লা আবর্জনা বা দূষণের ভয়
  • সন্দেহ এবং অনিশ্চয়তা সহ্য করতে সমস্যা হওয়া
  • সুশৃঙ্খল এবং প্রতিসাম্যযুক্ত জিনিসগুলোর প্রয়োজনবোধ করা
  • আক্রমণাত্মক বা ভৌতিক চিন্তাভাবনা 
  • ধর্মীয় বা নৈতিক ধারণাগুলোতে অতিরিক্ত ফোকাস
  • অর্ডার বা প্রতিসাম্য। এমন ধারণা যে সমস্ত কিছু সঠিকভাবে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
  • কুসংস্কারে বিশ্বাসী 
  • লক, সরঞ্জাম এবং সুইচ অর্থাৎ ছোট-খাটো জিনিস বার বার চেক করা।

ওসিডির সমস্ত ডোমেন জুড়ে জীবনের গুনমান হ্রাস করা হয়েছে। যদিও মনস্তাত্ত্বিক বা ফার্মাকোলজিকাল চিকিৎসার ফলে ওসিডি লক্ষণগুলো হ্রাস এবং কিউএল বৃদ্ধি পেতে পারে। লক্ষণগুলো পর্যাপ্ত চিকিৎসা অনুসরণ করেও মাঝারি স্তরে স্থির থাকতে পারে। পেডিয়াট্রিক ওসিডিতে প্রায় ৪০% এখনও প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ব্যাধি রয়েছে এবং প্রায় ৪০% অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। 

ওসিডির তেমন কোন চিকিৎসা না থাকায় জ্ঞানীয় আচরণ মূলক থেরাপিতে ওসিডি রোগীদের জন্য সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা।  কোনও বাধ্যবাধকতা না করে হস্তক্ষেপমূলক চিন্তাভাবনা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা  হয়। 

আপনার আশেপাশে কোন ব্যক্তির ব্যতিক্রমী অভ্যাস বা উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্য দেখলে তাদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করে তাদের সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিলে এবং তাদেরকে সময় দিলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। 


আফিয়া ইমরাদ তাহাসিন

ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি চিটাগং 

বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড বায়োটেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট 

তথ্যসূত্র –

  1. https://link.researcher-app.com/kDfa
  2. https://link.researcher-app.com/16DH
  3. https://youtu.be/A2HnIyEwLgo

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button