Biotechnology

ডার্ক ডিএনএ (DARK DNA) কি পারে আমাদের প্রচলিত বিবর্তন ধারাকে বদলে দিতে ?

মহাবিশ্বের রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার  (Dark Matter) এর কথা আমরা সবাই কমবেশি  জানি যা আমাদের মহাবিশ্বের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞরা এখনো তা পুরোপুরি ভাবে আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি। ঠিক এইরকম কিছু রহস্যময় জিন এর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে কিছু প্রজাতির প্রাণীর জিনোমে যাদের আমরা ডার্ক ডিএনএ (Dark DNA) বলে থাকি এবং যাঁদের কে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। ডার্ক ম্যাটার এর মতোই এদের অস্তিত্ব আছে জেনেও উপযুক্ত প্রযুক্তি না থাকায় তাদের আবিষ্কার করা এখনো সম্ভব হয়নি।

ডিএনএ সিকোয়েন্সিং টেকনোলজি এর সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এমন অনেক প্রশ্নের সমাধান পেয়েছে যা তারা অনেক শতাব্দী ধরে প্রাণীতে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। প্রানীর জিনোম ম্যাপিং করে আমরা এখন আরো ভালো ধারণা পেয়েছি কেনো সাপ এতো লম্বা হয় এবং কেনোই বা জিরাফ এর গলা এতো লম্বা ও আলাদা। জিনোম সিকোয়েন্সিং বিভিন্ন প্রানীর ডিএনএ এর মধ্যে মিল অমিল তুলে ধরতে সহায়তা করে এবং কিভাবে তারা তাদের অনন্য পদ্ধতিতে বিবর্ধিত হয় তা তুলে ধরে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে প্রাণীর জিনোমে কিছু জিন রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত থাকে যা অন্য প্রজাতির প্রানীর বেচেঁ থাকার জন্য তাদের উপস্থিতি আবশ্যক। এই উধাত্ত জিনগুলোকে ডার্ক ডিএনএ বলে। আর এই ডার্ক ডিএনএ সম্পর্কে আলোকপাত করলে তা হয়ত আমাদের প্রচলিত বিবর্তন ধারাকেও বদলে দিতে পারে।

সর্বপ্রথম এর সন্ধান পাওয়া যায় বালি ইঁদুরে (Psamommy obesus) যা একটি মরুভূমি জীবাণু প্রজাতি এবং উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য প্রাচ্যে এদের অবস্থান । বিজ্ঞানীরা যখন এই প্রাণিতে পিডিএক্স 1 নামক একটি জিনের সন্ধান করলেন যা ইনসুলিনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে তখন তারা দেখতে পেলেন যে এটি প্রায় নিখোঁজ ছিল, এরসাথে এর চারপাশের অন্যান্য জিনও নিখোঁজ ছিল। পিডিএক্স 1 সহ এই অনুপস্থিত কিছু জিন এতোই অপরিহার্য যে সেগুলি ছাড়া কোন প্রাণী বাঁচতে পারে না। তাহলে তারা কোথায়? বালি ইঁদুরের দেহের বেশ কয়েকটি টিস্যুতে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ পেয়েছে যা “নিখোঁজ” জিনগুলির নির্দেশাবলীতে তৈরি হয়ে থাকে। এটি কেবল তখনই সম্ভব যদি জিনগুলি জিনোমের কোথাও উপস্থিত থাকে, এতে বোঝা যায় যেত যে তারা সত্যিই নিখোঁজ ছিল না হয়তো কোথাও লুকিয়ে রয়েছে।

এই ধরণের ডার্ক ডিএনএ এর আগে কিছু প্রজাতির পাখিতে পাওয়া গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে সিকোয়েন্সড পাখির জিনোম থেকে ২৭৪ টি জিন “অনুপস্থিত” লক্ষ্য করেছেন । এর মধ্যে লেপটিন নামক শক্তি ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারি হরমোন এর উৎপাদনে অন্তর্ভুক্ত জিন বিজ্ঞানীরা  খুঁজে পাননি।

ঘটনা দুইটি বিশ্লেষণের পরে, আমরা উভয় ক্ষেত্রেই একটি মিল পেয়েছি যে এই  জিনগুলির ডিএনএ অনুক্রমের খুব উচ্চ মাত্রায় সাইটোসিন ও গুয়ানিন (নিউক্লিওটাইড বেস) রয়েছে। আমরা জানি যে সাইটোসিন ও গুয়ানিন সমৃদ্ধ সিকোয়েন্সগুলি নির্দিষ্ট ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর সময় সমস্যা সৃষ্টি করে। এতে বোঝা যায় আমরা যে জিনগুলির সন্ধান করছিলাম তা হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে খুঁজে বের করা কঠিন ছিল এই কারণে, আমরা গোপন অনুক্রমটিকে “ডার্ক ডিএনএ” বলে থাকি।

এখনও অবধি ডার্ক ডিএনএ দুটি অত্যন্ত বিচিত্র এবং স্বতন্ত্র ধরণের প্রাণীর মধ্যে উপস্থিত বলে মনে হচ্ছে। তবে এটি কতটা বিস্তৃত হতে পারে তা এখনও পরিষ্কার নয়। সমস্ত প্রাণীর জিনোমে ডার্ক ডিএনএ থাকতে পারে এবং যদি তা না হয় তবে কী জীবাণু এবং পাখিগুলিকে এত অনন্য করে তোলে? এখন যে প্রশ্নটি মাথায় আসবে তা হল ডিএনএ দ্বারা প্রাণীর বিবর্তন কীভাবে প্রভাবিত হয়? বিবর্তনের বেশিরভাগ পাঠ্যপুস্তকের সংজ্ঞাটি বলে যে এটি দুটি পর্যায়ে ঘটে: মিউটেশন ও প্রাকৃতিক নির্বাচন। মিউটেশন জীবের ডিএনএতে ভিন্নতা তৈরি করে, প্রাকৃতিক নির্বাচন পরে স্থির করে যে তা টিকে থাকবে কিনা এবং তাই ডার্ক ডিএনএ বিবর্তনের দিকটিকে পক্ষপাত করে।

“ডার্ক ডিএনএ” জিনোমগুলি কীভাবে উদ্ভূত হয়েছিল এবং বর্তমানে বিদ্যমান জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রক্রিয়া থেকে এখনও অনেক কিছু যে জানা বাকি সে সম্পর্কে অবশ্যই প্রশ্ন উত্থাপন করে। সুতরাং এই রহস্য সমাধানের জন্য আমাদের প্রযুক্তিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার ৷


কানিজ ফাহিমা 

প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

তথ্যসূত্রঃ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button