Women and Children

সিস্টাইটিস : মূত্রথলিতে প্রদাহ (পর্ব – ১)

এস.ই.গোল্ডস (S.E.Goulds) নামক একজন লেখক সাইন্টিফিক আমেরিকান (Scientific American) এ  সিস্টাইটিস নিয়ে ২০১২ সালে চমৎকার একটি প্রবন্ধ তথা আর্টিকেল লিখেছিলেন। 
প্রবন্ধটিতে বলা হয়েছিল – “আমি আসলে বার বার সিস্টাইটিসে আক্রান্ত হয়েছিলাম এবং গত বছর তথা ২০১১ সালে সিস্টাইটিসের লক্ষ্মণগুলো আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হতে দেখা যায়। প্রথমবার সিস্টাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার আগে আমি এই রোগের ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। শিক্ষাজীবনে আমি কখনোই এই রোগের নামও শুনি নি এবং কেউ আমাকে এই রোগ সম্পর্কে কোনো পরামর্শও দেন নি। পরবর্তীতে আমি যখন এই রোগে প্রথম আক্রান্ত হলাম তখন এটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। তখন আমি ভাবতাম এটি কেবল মহিলাদের ক্ষেত্রে একবার-ই হয়ে থাকে। কিন্তু আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ছিল! এটি মহিলাদের জীবনে কয়েকবার হতে পারে…..”

তেমনি আমাদের দেশে অনেকেই আছেন যারা সিস্টাইটিস সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে না। তাই আপনাদেরকে অবগত করার জন্যই আজ সিস্টাইটিস নিয়ে লেখা! 

(এই পর্বে মূলত সিস্টাইটিস কি, এর কারন, ধরন ও লক্ষন নিয়ে আলোচনা হবে)

প্রদাহ তথা “Inflammation” শব্দটির সাথে কম-বেশি অনেকেই পরিচিত। দেহের কোনো অংশ চুলকালে, লালচে হয়ে গেলে সেখান থেকে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। তন্মধ্যে সিস্টাইটিস-ও একধরনের প্রদাহ। মূলত, মূত্রথলিতে সৃষ্ট প্রদাহ সিস্টাইটিস (Cystitis) নামে পরিচিত। 

বেশিরভাগক্ষেত্রেই সিস্টাইটিস এর অন্যতম কারন হলো ইউরিনারি ট্র‍্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)। ইউরিনারি ট্র‍্যাক্ট ইনফেকশন তখনই সংঘটিত হয় যখন বহিরাগত ব্যাকটেরিয়া মূত্রথলি ও মূত্রনালীতে প্রবেশ করে জীবানুর মাধ্যমে নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি শুরু করে। তবে এটি প্রাকৃতিকভাবে মানবদেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়া দ্বারাও সংঘটিত হতে পারে। যখন ব্যাকটেরিয়াগুলো মানবদেহের ভিতরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তখনই এমনটি হয়।

কিন্তু, সিস্টাইটিস যে সবসময় ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশনের কারনেই হবে এমনটি নয় বটে।  বরং স্বাস্থ্যকর পণ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ গ্রহণের ফলেও মূত্রথলি ও মূত্রনালীর প্রদাহ হয়ে থাকে।

যাইহোক, সিস্টাইটিস এর চিকিৎসা কিছু নির্দিষ্ট কারনের উপর নির্ভর করে এবং সিস্টাইটিস যে কারও হতে পারে। তবে মহিলাদের মধ্যে সিস্টাইটিস হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। 

সিস্টাইটিস এর লক্ষণঃ

সিস্টাইটিসের বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু লক্ষণ হলো:

  • ঘন ঘন মূত্র ত্যাগের প্রবণতা
  • মূত্রথলি খালি হওয়ার পরও মূত্রত্যাগের প্রবণতা
  • ঘোলাটে এবং কটু বা উৎকট গন্ধ যুক্ত মূত্র
  • হালকা জ্বর 
  • মূত্রের সাথে রক্ত বের হওয়া
  • যৌন মিলনের সময় ব্যথা
  • মূত্রথলি পূর্ণ থাকা অবস্থায় চাপ অনুভূত করা 
  • উদয় এবং উদার এর পিছনে ব্যথা। 

যদি মূত্রথলির সংক্রমণ কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় তবে সেটি গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে কিডনিতে সংক্রমণ এর কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে যেমনঃ

  • সব সময় বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া
  • শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
  • দেহের পিছনে ও পাশে ব্যথা অনুভূত করা 

এবং দুটি লক্ষণ তথা জ্বর এবং রক্তমূত্র শুধু সিস্টাইটিস এর লক্ষণ নয়। কিডনিতে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমনের ফলে এ দুটি লক্ষণ দেখা যেতে পারে। 

সিস্টাইটিসের কারনঃ

সিস্টাইটিস বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে কিন্তু সিস্টাইটিস কোন ধরনের হবে সেটি এর কারনগুলোর উপর নির্ভর করে। সিস্টাইটিসের উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ হলো –

  • ইউরিনারি ট্র‍্যাক্ট ইনফেকশন
  • নির্দিষ্ট ড্রাগ বা ওষুধ গ্রহণ 
  • তেজস্ক্রিয় রশ্মির বিকিরণ 
  • বারংবার ক্যাথেটার এর ব্যবহার

সিস্টাইটিসের ধরনঃ

সিস্টাইটিস স্বল্পস্থায়ী (acute) হতে পারে আবার দীর্ঘস্থায়ী (chronic) ও হতে পারে। অ্যাকিউট তথা স্বল্পস্থায়ী সিস্টাইটিস হঠাৎ সংঘটিত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সিস্টাইটিস দীর্ঘসময় ধরে থাকে যা মূত্রথলির অনেকগুলো স্তরের টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

স্বল্পস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী সিস্টাইটিস হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। তদুপরি কারণগুলোর ওপর ভিত্তি করে সিস্টাইটিস কে বিভিন্ন ধরনে বিভক্ত করা হয়। 

ব্যাকটেরিয়াল সিস্টাইটিস (Bacterial Cystitis) :

যখন বহিরাগত ব্যাকটেরিয়া দেহের মূত্রথলি ও মূত্রনালীতে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায় তখন সেটি ব্যাকটেরিয়াল সিস্টাইটিস নামে পরিচিত। এছাড়াও মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়াগুলো যখন নিজেদের মধ্যকার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তখনও ব্যাকটেরিয়াল সিস্টাইটিস হতে পারে। 

তাই যখনই মূত্রথলির সংক্রমণ দেখা যাবে তখনই চিকিৎসা নেওয়া অত্যাবশ্যক নতুবা সংক্রমণ কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। 

ওষুধ বা ড্রাগ গ্রহণের ফলে সিস্টাইটিস (Drug-induced Cystitis) :

নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ গ্রহণ মূত্রথলিতে প্রদাহের কারণ হতে পারে। ওষুধ মূলত দেহের অন্ননালী ও পরিপাকতন্ত্র হয়ে ইউরিনারি সিস্টেম (Urinary System) এর মাধ্যমে নির্গত হয়। এমনকি কিছু ওষুধ মূত্রথলিতে জ্বালাতন অবস্থার সৃষ্টি করে।

উদাহরণস্বরূপ কেমোথেরাপিজনিত ড্রাগগুলো যেমনঃ সাইক্লোফসফামাইড (Cyclophosphamide) সিস্টাইটিস ঘটাতে পারে। 

রেডিয়েশন সিস্টাইটিস (Radiation Cystitis) :

ক্যান্সার কোষ ও টিউমারের ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলো ধ্বংস করার জন্য রেডিয়েশন থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু রেডিয়েশন থেরাপি প্রয়োগের ফলে দেহের ভালো তথা স্বাস্থ্যকর কোষগুলোর ক্ষতিসাধন ঘটে। তাই পেলভিক অঞ্চলে যদি থেরাপি দেওয়া হয় তখন এটি মূত্রথলিতে প্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

কেমিক্যাল সিস্টাইটিস (Chemical Cystitis) :

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক ধরনের রাসায়নিক পণ্য ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পণ্য মূত্রথলিতে প্রদাহ তথা সিস্টাইটিস ঘটায়। যেমন-

  • স্পার্মিসাইডাল জেলি
  • ডায়াফ্রামের ব্যবহার
  • মেয়েদের পরিষ্কার থাকার জন্য ব্যবহৃত স্প্রে
  • গোসলের সময় ব্যবহৃত কেমিক্যাল বিশেষ করে “Bubble bath” এর সময় ব্যবহৃত কেমিক্যাল।

উপরোক্ত সিস্টাইটিস ছাড়াও কিছু সিস্টাইটিস রয়েছে যেগুলোর ক্ষেত্রে অন্যান্য লক্ষ্মণ দেখা যায় যেমনঃ ডায়াবেটিস, কিডনিতে পাথর, এইচআইভি (HIV), প্রস্টেট বড় হয়ে যাওয়া, শিরদাঁড়া ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। 

প্রকৃতপক্ষে সিস্টাইটিস ক্ষতিকর হলেও এর প্রতিকার ও চিকিৎসা উভয়ই আছে। তাই পরবর্তী পর্বে এগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।


সামসুন নাহার প্রিয়া

বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট 

মাওলানা ভাসানী সাইন্স এন্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি 

Reference:

  1. https://www.healthline.com/health/cystitis
  2. https://blogs.scientificamerican.com/lab-rat/how-bacteria-invade-your-urinary-tract/

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button