Medical Science

রক্তের সম্পর্কে রক্তগ্রহণ: পরিণাম হতে পারে বিরল প্রাণঘাতী রোগ

রক্তদান প্রক্রিয়ার সাথে কোনো না কোনভাবে আমরা সকলেই পরিচিত। খালার অস্ত্রোপচারের জন্য রক্তের প্রয়োজনে হয়ত বন্ধুর দ্বারস্থ হয়েছি কিংবা দুর্ঘটনাগ্রস্ত অপরিচিতকে রক্ত দিতে নিজেরা ছুটেছি হাসপাতালে, অন্তত ফেসবুকের পাতায় রক্তদাতার সন্ধান বার্তা দেখেছি নিশ্চয়ই। তবে আমরা সাধারণত রক্তের প্রয়োজনে সবার আগে দ্বারস্থ হই নিকট আত্মীয়দের। তাদের সাথে রক্তের গ্রুপে মিল থাকায়, সহজেই টিস্যু ম্যাচ করায় এবং তাদের জীবনভ্যাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকায় আত্মীয়ের রক্ত নেয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ বলে মনে করে থাকি। কিন্তু বিষয়টি সবসময় এমন নাও হতে পারে, বলছে বিজ্ঞান। এর ফলে একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক রোগ হবার আশঙ্কা থেকে যায়। রোগটির নাম ট্রান্সফিউশন এসোসিয়েটেড গ্রাফট ভার্সেস হোস্ট ডিজিজ (Transfussion Associated Graft vs Host Disease).

রক্ত শরীরের অভ্যন্তরীণ একটি পরিবহন কলা। ফুসফুস থেকে দেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়া, প্রত্যেক টিস্যুতে পুষ্টির যোগান দেয়া, শরীর অভ্যন্তরে প্রবেশকৃত রোগ-জীবাণুকে প্রতিহত করা, শরীরের বর্জ্য পদার্থকে যকৃত (Liver) ও বৃক্কে (Kidney) নিয়ে এসে রেচনে সহায়তা করা, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা – সব কাজেই রক্তের ভূমিকা অপরিহার্য। রক্তশূন্যতা, ক্যান্সার, অস্ত্রোপচার, বৃক্ক ও যকৃতের রোগ, থ্যালাসেমিয়া, সিকেল সেল অ্যানিমিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন রোগে রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে রক্তের চাহিদা ছিল আনুমানিক ৮ লাখ ব্যাগ।

রক্তের দু’টি অংশ; রক্তরস (৫৫%) ও রক্তকণিকা (৪৫%)। রক্তকণিকা তিন ধরনের। এগুলো হল:

১। লোহিত রক্ত কণিকা (Erythrocytes): অক্সিজেন পরিবহন করা এ কণিকার প্রধান কাজ। 

২। শ্বেত রক্ত কণিকা (Leukocytes): এ কণিকা বাইরের রোগ জীবাণুকে প্রতিহত করে। 

৩। অণুচক্রিকা (Thrombocytes): এ কণিকা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। 

আলোচ্য রোগটি হতে পারে এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা সংশ্লিষ্ট জটিলতার কারণে। শ্বেত রক্ত কণিকা মূলত ৫টি উপাদানের মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সচল রাখে। এগুলো হল:

  • নিউট্রোফিলস (Neutrophils)
  • ইউসিনোফিলস (Eosinophils)
  • বেসোফিলস (Basophils)
  • লিম্ফোসাইটস (Monocytes)
  • মনোসাইটস (Monocytes)

এর মধ্যে লিম্ফোসাইট আবার ২ ধরনের; ‘বি’ লিম্ফোসাইটস (B lymphocytes) ও ‘টি’ লিম্ফোসাইটস (T lymphocytes). ‘টি’ লিম্ফোসাইটের কাজ হল, বাইরে থেকে প্রবেশকৃত ক্ষতিকর পদার্থকে (এন্টিজেন) শনাক্ত করা এবং তা ধ্বংসে ভূমিকা রাখা। কোনো সুস্থ মানুষের রক্ত রোগীকে দেয়ার আগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই লিম্ফোসাইটগুলোকে আলাদা করে বাদ দেয়া হয়। বর্তমানে রোগীকে প্রধানত লোহিত রক্ত কণিকাই দেয়া হয় যাতে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু এরপরও পরিসঞ্চালনকৃত রক্তে কিছু পরিমাণ ‘টি’ লিম্ফোসাইট থেকে যেতে পারে। এই বহিরাগত ‘টি’ লিম্ফোসাইটগুলোকে রক্ত গ্রহীতার ‘টি’ লিম্ফোসাইট এন্টিজেন হিসেবে শনাক্ত করে নষ্ট করে দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে গ্রহীতার শরীর একে এন্টিজেন হিসেবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে দাতার রক্তের ‘টি’ লিম্ফোসাইটগুলো উল্টো রক্ত গ্রহীতার ‘টি’ লিম্ফোসাইটকেই ধ্বংস করতে শুরু করে। এই জটিল অবস্থার নামই ট্রান্সফিউশন এসোসিয়েটেড গ্রাফট ভার্সেস হোস্ট ডিজিজ (ta-GvHD). 

এ রোগের লক্ষণ:

  • জ্বর
  • ত্বকে ফুসকুড়ি
  • ত্বকে চুলকানি
  • বমি
  • ডায়রিয়া
  • মাথা ঘোরা
  • যকৃত ঠিকভাবে কাজ না করা
  • সর্দি ইত্যাদি।                                                   

চিত্র: ত্বকে গ্রাফট ভার্সেস হোস্ট ডিজিজের লক্ষণ

আক্রান্তের শরীরে রোগের লক্ষণগুলো রক্ত গ্রহণের ১-২ সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ পায়। এ রোগে মেরু রজ্জুর তীব্র ঘাটতি (Profound Marrow Aplasia) দেখা দেয় যার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। লক্ষণ প্রকাশ পাবার ১-৩ সপ্তাহের মধ্যেই বেশিরভাগ রোগী বিভিন্ন রকম প্রদাহের (Infection) তীব্রতার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যহার শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ। ত্বকের, এবং ক্ষেত্র বিশেষে যকৃত ও অস্থিমজ্জার বায়োপসি পরীক্ষার (Biopsy) মাধ্যমে এ রোগ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়।                                        

নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলো এ রোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করে:

  • রক্ত গ্রহীতার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে। যেমন- ক্যান্সার রোগী।
  • সঞ্চালনকৃত রক্তে ‘টি’ লিম্ফোসাইটের পরিমাণের আধিক্য। 
  • রক্ত গ্রহীতার ও দাতার মধ্যে হিউম্যান লিউকোসাইট এন্টিজেন (Human Leukocyte Antigen; HLA) এর সাদৃশ্য থাকলে।

ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ (শতকরা ৫০ ভাগ জিনগত সাদৃশ্য) অর্থাৎ মা-বাবা, সন্তান, ভাই-বোন এবং সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভ (শতকরা ২৫ ভাগ জিনগত সাদৃশ্য) অর্থাৎ চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও তাদের ছেলেমেয়েদের রক্তের সাথে HLA-এর মিল থাকার সম্ভাবনা অধিক। 

এ জটিলতা মেরুরজ্জু (Bone Marrow) ও স্টেম সেল (Stem Cell) প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হতে পারে। মূলত এ ধরনের ক্ষেত্রেই গ্রাফট ভার্সেস হোস্ট ডিজিজ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে। এ কারণে চিকিৎসকরাও সচেতন থাকেন এবং প্রতিস্থাপনের আগেই HLA-এর সাদৃশ্য রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নেন। 

অন্যদিকে, শুধুমাত্র রক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ০.১-১ ভাগ। এটি খুবই বিরল হওয়ায় বাংলাদেশের বেশিরভাগ হাসপাতালেই এ সম্পর্কিত কোনো সতর্কতা অবলম্বন করা হয় না এমনকি এর ঝুঁকি সম্পর্কে রোগীদের জানানোও হয় না। অথচ রোগটি বিরল হলেও যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী তাই জনসাধারণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। অত্যন্ত সংকটাপন্ন পরিস্থিতি না হলে নিকট আত্মীয়ের রক্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিৎ। এ কথা তো সকলেই মানবেন, প্রশ্নটা যখন জীবনের ১ তখন একটি বড় সংখ্যা।  


পঙক্তি আদৃতা বোস

২য় বর্ষ,

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, 

ঢাকা-১১০০।


তথ্যসূত্র:

১। Transfusion associated graft versus host disease।NCBI

২। Transfusion-associated graft-versus-host disease (TA-GVHD) | Australian Red Cross Lifeblood

৩। Transfusion Associated Graft Versus Host Disease – an overview। Science Direct

৪। Bangladesh is still to meet the demand of safe blood supply।WHO

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button