Biotechnology

একজন বাঙালি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের বায়োটেক ইন্ডাস্ট্রি

সময়টা ১৯৭১। আমাদের পূর্ব পাকিস্তান তখন স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে লড়াই করছে। ঠিক সেই সময়টাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সেনেকটেডি শহরের “জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি”র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে কাজ করছিলেন একজন বাঙালি বিজ্ঞানী। জয়েনিং এর পরবর্তীতে প্রথম দিককার প্রজেক্টে তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না, ছিলেন খানিকটা হতাশও। কিন্তু তারপর সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটা গবেষণাতে সৃষ্টি করলেন ইতিহাস। সেই ইতিহাস জানার আগে চলুন, খানিকটা পেছনে ফিরে তাকানো যাক। 

০৪ এপ্রিল ১৯৩৮। সাঁইথিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।  ব্যবসায়ী পিতা ও গৃহিণী মায়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আনন্দ। পরিবারের সাত সন্তানের ভেতর তিনি ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ। শৈশব থেকেই তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন এই ছেলেটির বিজ্ঞান ও প্রাচীন সংস্কৃত ভাষার উপর ছিলো তুমুল আগ্রহ। স্থানীয় স্কুল ও রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হলেন সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে রসায়নে আন্ডারগ্রাজুয়েশন শেষ করে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ডিসিপ্লিন থেকে এমএসসি ও পিএইচডি কমপ্লিট করে তিনি তখন ড.আনন্দমোহন চক্রবর্তী। এরপর ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রীর অফারই তাকে নতুন করে তার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। সেখান থেকেই প্রধানত তিনি পরিচিত হন সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার সাথে যা তাকে পরবর্তীতে অমরত্ব এনে দেয়। এই ব্যাকটেরিয়া গণ কে তিনি এতোটাই ভালোবেসেছিলেন যে, নিজের ইমেইল আইডি তে ও নিজের নামের পরিবর্তে ব্যবহার করেছিলেন সিউডোমো (Pseudomo) নামটি। ড. আনন্দমোহন চক্রবর্তী থেকে “মিস্টার সিউডোমোনাস” হওয়ার এই ইতিহাসটি জানতে চলুন, আবার ফিরে যাওয়া যাক জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানিতে।

পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে তখন কেবলই অল্প-বিস্তর সচেতন হতে শুরু করেছে মানুষ। পৃথিবীর বিশাল সামুদ্রিক জলরাশিতে বিভিন্ন সামুদ্রিক জাহাজ, ট্যাংকার ও যানের মাধ্যমে হওয়া তেল (ক্রুড ওয়েল) নিঃসরণ এবং এর প্রভাবে সামুদ্রিক পানি দূষণ যে ক্রমাগত সামুদ্রিক  বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তার সমাধান খুজতে গিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছিলেন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদগণও। সেসময় বিজ্ঞানীরা মোট চার প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া খুজে পান যারা এই তেলগুলোকে ডিগ্রেড করতে সক্ষম ছিলো। কিন্তু সমুদ্রের বিশাল জলরাশিকে পরিশোধন করার মতো কার্যকর ছিলোনা একটি প্রজাতিও। ঠিক সেই সময়টাতে, জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং ছিলো তার শৈশবে। আর জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং বা রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ টেকনোলজি দিয়ে যে এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর কর্মদক্ষতা আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব তা সর্বপ্রথম মাথায় এসেছিলো এই তুমুল মেধাবী ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানীর ড.চক্রবর্তীরই। ব্যস! নেমে পড়লেন গবেষণায়। তত্ত্বীয়ভাবে সেসময়ের বিজ্ঞানীরা জানতেন যে , এই চারটি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির প্লাজমিডেই আছে তেল-বিপাকীয় বা তেল হ্রাস করার জন্য দায়ী জিনগুলো (যে জিনগুলো তেল-বিপাকীয় এনজাইম তৈরীতেও সক্ষম)। এছাড়া সেসময় জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং এ বাহক হিসেবে প্লাজমিডের ব্যবহারও শুরু হয়েছিলো। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় বললে জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে এই জিনগুলোকে ব্যাকটেরিয়ার অন্য প্রজাতিতেও স্থানান্তর সম্ভব। এটিকে তত্ত্ব থেকে বাস্তবে রুপান্তরের কাজটি নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন সহকর্মীদের মাঝে “এআই” নামে পরিচিত ড.আনন্দমোহন চক্রবর্তী। তিনি নিজের উদ্ভাবিত জেনেটিক ক্রস-লিংকিং পদ্ধতিতে এই “তেল ডিগ্রেডেশনে সক্ষম প্লাজমিড” স্থানান্তর করলেন! একইসাথে, সমুদ্র দূষণকারী ক্রুড অয়েলের ভেতরকার হাইড্রোকার্বনকে সর্বপ্রথম সবচেয়ে কার্যকরী উপায়ে ল্যাবে ডিগ্রেডেশন করতে সক্ষম হলেন। আর সৃষ্টি হলো ব্যাকটেরিয়ার নতুন প্রজাতি। প্রথম সুপারবাগ। নাম Pseudomonas putida ড. চক্রবর্তীর কাছে এটা ছিলো এক অন্যরকম তৃপ্তির ও সফলতার, তিনি চাইছিলেন তার উদ্ভাবনকে জার্নাল পেপার বা কনফারেন্স পেপার হিসেবে প্রকাশ করতে। কিন্তু বাঁধ সাধলেন জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির তার সহকর্মী গবেষকগণ। কারণ, তারা পেরেছিলেন এই উদ্ভাবনের মাহাত্ম্য ও বিশালতা আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে, তারা ড. চক্রবর্তীকে পরামর্শ দিলেন, এই নতুন প্রজাতিকে তার নিজের নামে প্যাটেন্ট করিয়ে নিতে। কিন্তু এবার যা হলো, তা বায়োটেকনোলজি তো বটেই, আইনের দুনিয়াতেও এক বিস্ময়।

ইউএস প্যাটেন্ট অফিসের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো লিভিং অর্গানিজমকে কেউ নিজের নামে প্যাটেন্ট করতে পারবে না। এই নিয়মই এবার কাল হয়ে দাড়ালো। প্রত্যাখ্যাত হলেন ড.আনন্দমোহন চক্রবর্তী। তবে হাল ছাড়লেন না, তার উদ্ভাবন তো পুরোপুরি মৌলিক, তার ব্যাকটেরিয়া প্রজাতিও একেবারে নতুন সৃষ্টি; তাহলে কেন তিনি এটাকে প্যাটেন্ট করতে পারবেননা? প্রায় এক দশক ধরে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, ইউএস প্যাটেন্ট অফিসের কমিশনার সিডনি ডায়মন্ড ও ড. আনন্দমোহন চক্রবর্তীর এ বিরোধ শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকলো সুপ্রিম কোর্টে। রায় আসলো। জিতে গেলো ড. চক্রবর্তীর পরিশ্রম। ইউএস প্যাটেন্ট অফিস প্যাটেন্ট নং ৪২৫৯৪৪৪। এই মামলাটি এতোটাই খ্যাতি অর্জন করলো যে, বর্তমানে বিভিন্ন ল’ স্কুলে “ডায়মন্ড বনাম চক্রবর্তী” শিরোনামে এটিকে কেস স্টাডি হিসেবে পড়ানো হয়। ল স্কুল থেকে আবার ফিরে আসি বায়োটেকনোলজিতে। 

ছবিঃ সুপ্রিম কোর্টের সামনে দাড়িয়ে আছেন ড. আনন্দমোহন চক্রবর্তী (সূত্র: ইন্টারনেট, ফটোগ্রাফার অজানা)        

“Father of Patent Microbiology” উপাধি পাওয়া ড. আনন্দমোহন চক্রবর্তীর এ জয় যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক ইন্ডাস্ট্রিতে বিপ্লবের সূচনা করেছিলো। গবেষকরা শুরু করেছিলেন একের পর এক উদ্ভাবন। সেদিন একজন ভারত উপমহাদেশীয় বাঙালি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবনই নির্ধারণ করে দিয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্রের মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের বায়োটেক ইন্ডাস্ট্রির ভাগ্য। আজকের যুক্তরাষ্ট্রের শত বিলিয়ন ডলারের (এবং বিশ্বের  প্রায় আটশত বিলিয়ন ডলারের) এই বায়োটেক সেক্টর অনেকাংশেই তার কাছে ঋণী। যদি ১৯৭২ সালের সেইদিনে ইউএস প্যাটেন্ট অফিস থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি হাল ছেড়ে দিতেন, তবে হয়ত জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উদঘাটন করতে পুরো পৃথিবীই বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়তো। 

এই অসাধারণ উদ্ভাবনী চিন্তাচেতনার অধিকারী মানুষটি শুধু একটি প্যাটেন্ট সাফল্যেই থেমে থাকেননি, ড.আনন্দমোহন চক্রবর্তীর ল্যাবে ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করে ক্যান্সার, সিস্টিক ফিব্রোসিস, এইডস, ম্যালেরিয়া সহ নানা রোগের প্রতিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন CDG Therapeutics ও Amrita Therapeutics এর মতো বায়োটেক স্টার্টআপ। প্রায় ৬০ বছরের কর্মময় ক্যারিয়ারে তিনি ২৫০ এরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তার লেখা দুইটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীঃ Three Daughters এবং Three Journeys: Quest for Cancer Cure and Bugging Cancer: Daring to Dream বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা, হয়েছেন একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠনের এডভাইজার, মেম্বার।  এমনকি International Centre for Genetic Engineering and Biotechnology (ICGEB) প্রতিষ্ঠায় সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। “জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং” ফিল্ডে অবদান রাখায় ভারত সরকার তাকে “পদ্মশ্রী” উপাধিতে ভূষিত করেছে। 

গত ১০ জুলাই ২০২০ তারিখে ৮২ বছর বয়সে তিনি তার সুদীর্ঘ ৬০ বছরের কর্মময় জীবনের ইতি টানেন, ছেড়ে যান আমাদের সকলকে। তবে তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে, বাঙালির গৌরবের ইতিহাস হয়ে। আর যুগ যুগ ধরে পৃথিবী মনে রাখবে মিস্টার সিউডোমোনাসকে।


মোঃ রাসেল উদ্দিন

জিন প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগ

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসূত্রঃ

01. https://www.nature.com/articles/s41587-020-00785-

02. https://link.springer.com/article/10.1007/s42398-020-00117-x

03.https://en.m.wikipedia.org/wiki/Diamond_v._Chakrabarty                                                                                                                                                            

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button