Medical Science

অটোইমিউন ডিজিজ নিয়ে কিছু কথা!

ইমিউনিটি হলো আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা আমাদেরকে ক্ষতিকর রোগ জীবাণু থেকে রক্ষা করে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। ইমিউন সিস্টেমের কিছু উপাদান সম্মিলিতভাবে আমাদের দেহের এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোড়দার করতে সহায়তা করে যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য   কিছু ইমিউন উপাদান হল-শ্বেত রক্ত কণিকা, এন্টিবডি, বোন মেরু,থাইমাস,স্প্লীন,লিম্ফেটিক সিস্টেম।  কিন্তু এই ইমিউনিটি ই আবার আমাদের রোগ সৃষ্টির কারণ হতে পারে যখন এটি ভুলক্রমে আমাদের দেহের সুস্থ কোষ, টিস্যুকে বহিরাগত ভেবে ধ্বংস করে। আর তখনি তৈরি হয় অটোইমিউন ডিজিজ। অর্থাৎ, যখন ইমিউন সেল গুলো রোগ জীবাণু, ক্যামিক্যাল,ক্যান্সার সেল ইত্যাদি  ক্ষতিকর জিনিস আর দেহের সুস্থ কোষের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনা তখনই তৈরি হয় অটোইমিউনিটি যা অটোএন্টিবডি নামে এক ধরনের প্রোটিন রিলিজের মাধ্যমে আমাদের সুস্থ কোষ,টিস্যু কিংবা জয়েন্টে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করে এবং ফলস্বরূপ কিছু ডিজিজ হয়ে থাকে যাদেরকে বলা হয় অটোইমিউন ডিজিজ।

অটোইমিউন ডিজিজ কেন হয়?

বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাননি যার কারণে অটোইমিউন ডিজিজ হয়ে থাকে। কিছু গবেষণায় দেখা যায় যে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে অটোইমিউন ডিজিজ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বেশি।এটি মূলত ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সের নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

জাতিভেদে কিছু অটোইমিউন ডিজিজের প্রাদুর্ভাবও লক্ষ্য করা যায়। যেমন: আফ্রিকান- আমেরিকান এবং হিসপ্যানিকদের লুপাস হওয়ার সম্ভাবনা ককেশিয়ানদের তুলনায় বেশি।

কিছু অটোইমিউন ডিজিজের সাথে জিনগত  ফ্যাক্টর জড়িত বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। লুপাস এবং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস অটোইমিউন ডিজিজ এর মধ্যে অন্যতম।ফ্যামিলি হিস্ট্রি তে এইসব অটোইমিউন ডিজিজ থাকলে সেই পরিবারের সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি থাকে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে বর্তমানে বেশিরভাগ রোগ জীবাণুর জন্য ভেক্সিন,এন্টিসেপ্টিক ব্যবহার করার কারণে আমাদের ইমিউন সিস্টেম রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে আগের তুলনায় কম লড়াই করতে হয় যা আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে প্রণোদিত করে দেহের সুস্থ কোষ,টিস্যু ইত্যাদিকে ধ্বংস করার জন্য।

গবেষণায় আরো দেখা যায় যে, পরিবেশগত কিছু কারণ অথবা, জীবণধারণের ধরন হতে পারে অটোইমিউন ডিজিজের অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে, যারা স্মোকিং করে তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা স্মোকিং না করা মানুষজনের থেকে বেশি। আরেকদিকে, শহরে বিভিন্ন প্রকার দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ায় এবং বিষাক্ত ক্যামিকেল এর উপস্থিতির কারণে শহুরে বাসিন্দাদের অটোইমিউন ডিজিজ হওয়ার ঝুঁকি অত্যধিক।

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অটোইমিউন ডিজিজ:

এখন পর্যন্ত ৮০ টির ও অধিক অটোইমিউন ডিজিজ রয়েছে যার মধ্যে বেশ কিছু খুব মারাত্নক। এর মধ্যে কয়েকটি সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো।

টাইপ ডায়াবেটিস– প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল ইনসুলিন নামক হরমোন তৈরি করে যা দেহের ব্লাড স্যুগার এর মাত্রা ঠিক রাখে। টাইপ ১ ডায়াবেটিস ম্যালিটাস এর ক্ষেত্রে ইমিউন সিস্টেম প্যানক্রিয়াসের বিটা সেলগুলোকে নষ্ট করে দেয় যার ফলে দেহে ইনসুলিন তৈরি থেমে যায়। এতে করে অধিক মাত্রার ব্লাড স্যুগার কিডনি,হার্ট, নার্ভাস সিস্টেম, চোখ ইত্যাদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়।

রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস– এ ধরনের ইমিউন ডিজিজে ইমিউন সিস্টেম দুই হাঁড়ের মধ্যকার জয়েন্টে আক্রমণ করে। যার ফলে জয়েন্টে তীব্র ব্যাথা অনুভূত হয় এবং জয়েন্টগুলো ফুলে শক্ত হয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যাক্তির জয়েন্টের ফ্ল্যাক্সিবিলিটি কমে যায়,  মাংশপেশীতে ব্যাথা হয় এবং চলাফেরা করতে সমস্যা হয়। রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস এ পুরুষের তুলনায় নারীরা আক্রান্ত হয় বেশি।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস– মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নার্ভ সেলের আবরণ মায়েলিন শিথ কে ধ্বংস করে দেয় যার ফলে মস্তিস্কের স্বাভাবিক কমান্ড অথবা মেসেজ টান্সফার হওয়ার গতি কমে যায়। এই ধরনের অটোইমিউন ডিজিজ হলে শরীর দূর্বল হয়ে যায়, দেহের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয় এবং সর্বোপরি চলাফেরায় সমস্যা সৃষ্টি করে।

অটোইমিউন ভাস্কুলাইটিস– ইমিউন সিস্টেম যখন দেহের রক্তনালিকায় আক্রমণ করে তখনি এ অটোইমিউন ডিজিজ এর সৃষ্টি হয়। ইমিউন সিস্টেম ধমনী এবং শিরাগুলোকে স্বাভাবিকের তুলনায় সংকীর্ণ করে দেয়। যার ফলে শরীরের বিভিন্ন অশে রক্ত চলাচল  কমে যায় এবং দেহে সৃষ্টি হয় নানাবিধ জটিল সমস্যার।

গ্রেভস ডিজিজ– এ ধরনের অটোইমিউন ডিজিজের ক্ষেত্রে দেহের ইমিউন সিস্টেম  থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কে আক্রমণ করার ফলে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড থেকে প্রয়োজনের অধিক থাইরয়েড হরমোন তৈরি হয়। অতিরিক্ত এ থাইরয়েড হরমোন এর কারণে ওজন হ্রাস, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, দ্রুত হারে হৃদস্পন্দন দেখা যায়।


আয়েশা আক্তার

বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ,নোবিপ্রবি।

হেড অব কন্টেন্ট ক্রিয়েশন,বায়ো ডেইলি।


তথ্যসূত্র :

https://medlineplus.gov/ency/article/000816.htm

https://www.healthline.com/health/autoimmune-disorders

https://www.gene.com/stories/what-causes-autoimmune-diseases

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button