Microbiology

অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স-মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ?

 অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স, বর্তমানে পুরো বিশ্বে একটি আলোচিত বিষয়। কোনো কোন ক্ষেত্রে ধারণা করা হয় এটি ভাইরাসের থেকেও বেশি মারণঘাতি। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে  অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স আরো মারণঘাতি হয়ে উঠেছে। এই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স আসলে কি? এর জন্য আমাদের প্রথমেই জানা লাগবে অ্যান্টিবায়োটিক কি এবং কিভাবে মানবদেহে কাজ করে।

অ্যান্টিবায়োটিক মূলত এক ধরনের ঔষধ যা মানবদেহে ব্যবহার করা হয় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধে। অ্যান্টিবায়োটিক দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কোষে শক্তি উৎপাদন বন্ধ করে। এর ফলে দেহে ব্যাকটেরিয়া আর বেঁচে থাকতে পারে না।

যখন ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিপরীতে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে তখন এই অবস্থাকে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বলা হয়। যেই ব্যাকটেরিয়াকে বিনষ্ট করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা হয় সেটিই অ্যান্টিবায়োটিকের বিপরীতে এক ধরণের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এর ফলে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না।

১৯২৮ সালে আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং সর্বপ্রথম পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন। এর পর থেকে ধীরে ধীরে রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়াও আবিষ্কার হতে থাকে। যেমন ই-কোলাই একটি পেনিসিলিন রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। আসলে দেহের ভিতরে থাকা জীবানু সবসময় নতুন ড্রাগ এর বিপরীতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করে এবং এক সময় সক্ষম হয় যা পরবর্তীতে অন্যান্য জীবানুর সাথে এই প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য স্থানান্তর করে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স এর কারণঃ

  • আধুনিক ঔষধবিদ্যায় এটি একটি মারাত্নক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক এর অতিরিক্ত ব্যবহার এর মূল কারণ। ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক এর ব্যবহার এর ফলে দেহে থাকা জীবানুগুলোর মধ্যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি প্রবণতা তৈরি হয় এবং এক সময় সক্ষম হয়।
  • অনেক সময় দেখা যায় খুব সাধারণ রোগ যা অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব সেসব ক্ষেত্রেও মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকে।
  • ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা।
  • .সঠিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করাও অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স এর আরেকটি কারণ।
  • অ্যান্টিবায়োটিক এর পুরো কোর্স শেষ না করা। দেখা যায় একটি অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স ৭ দিনের হলেও ৪ দিনের দিনই রোগটি সেরে যায়। তাই অনেকে তখন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দেয়। এতে করে শরীরে বিদ্যমান থাকা যেই জীবানুগুলো রয়ে যায় যা সাধারণত রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। সেই জীবাণুগুলো ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হয়ে উঠে।
  • অনেক সময় দেখা যায় গরু মোটাতাজাকরণে ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর ফলেও অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়ে থাকে।
  • নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার এর হার কমে যাওয়া। একটি গবেষণায় দেখে গেছে বিশ্বের ১৮ টি বড় ঔষধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৫ টি কোম্পানিই অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এর কারণ হলো ব্যবসায়িক ভাবে লাভজনক না হওয়া। এছাড়া যেই কোম্পানিগুলো এখনও নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারে কাজ করে যাচ্ছে তারাও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্বচ্ছতার অনুপস্থিতি, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রকম ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজনীয়তা। এত প্রতিবন্ধকতা পার করে কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
  • মিউটেশন এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার জিনগত পরিবর্তন হচ্ছে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হয়ে যাচ্ছে।
ফলাফলঃ

অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স এর ফলে মানুষ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা অথবা মাইনর কোনো রোগ যা আগে সহজেই চিকিৎসাযোগ্য ছিল, অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স এর ফলে তা চিকিৎসার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে মানুষের সাধারণ জীবনযাপনে। অসুস্থতার হার বেড়ে যাচ্ছে, মৃত্যুহার বেড়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য পাওয়ারফুল ঔষধ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রোগীদের মধ্যে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কমে যাচ্ছে। যার ফলে চিকিৎসা আরো কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতে মারাত্নক হলে রোগীকে সম্পূর্ণ আইসোলেশনে রাখতে হয়। কারণ তখন সুস্থ মানুষদেরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এক গবেষণায় দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২৮ লাখ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছে এবং ৩৫০০০ মানুষ মারা যাচ্ছে। এবং অনেককে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করতে হচ্ছে।

প্রতিরোধের উপায়ঃ

এই সমস্যা নিরসনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে,

১. ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে।

২. প্রয়োজন ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. কোর্স শেষ হওয়ার পর যদি অ্যান্টিবায়োটিক থেকে যায় তাহলে সেটি অন্য কাউকে ব্যবহার হতে বিরত রাখতে হবে।

৪. প্রতিনিয়ত হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া, অসুস্থ ব্যাক্তির সংস্পর্শে না যাওয়া এবং নিরাপদ যৌন মিলন করা।

এছাড়াও সরকারের এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ফার্মেসিগুলোতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া যাতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না করে সে বিষয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং আইনভঙে কঠোরতম শাস্তির বিধান করতে হবে। তাহলেই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স প্রতিরোধে সক্ষম হওয়া যাবে।

জীবনটা আমাদের। তাই জীবন বাঁচাতে হলে আমাদের নিজেদের সর্বপ্রথম সচেতন হতে হবে। নিজে সচেতন হলেই সবাই সচেতন হবে এবং সর্বোপরি অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স এর মত মারাত্নক সমস্যা প্রতিরোধ করা যাবে। অন্যথায় সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন সামান্য অসুখেও মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে।


সাদী আহমেদ

৩য় বর্ষ

বায়োটেকনোলোজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসুত্রঃ

https://en.wikipedia.org/wiki/Antimicrobial_resistance

https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4378521/

https://www.yourgenome.org/facts/what-is-antibiotic-resistance

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button