COVID-19

মাত্র ৫ ডলারে হবে করোনা পরীক্ষা

এতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ সংস্থা FDA কর্তৃক অনুমোদিত প্রায় সবরকম করোনা শনাক্তকরণ পদ্ধতি ছিল প্রায় ৪০ মার্কিন ডলার মূল্যের কম-বেশী পর্যায়ে। যার কারণে পৃথিবীব্যাপী টেস্ট কিটের দ্রুততম সরবরাহ নিশ্চিত করা হলেও একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর জন্য এই পরীক্ষা করানো ছিল আর্থিক ভাবে দুর্বিষহ।

কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক কোম্পানি Abbott দাবি করছে সম্পূর্ণ অভিনব এক পদ্ধতি আবিষ্কারের। বহুল প্রচলিত RT-PCR পদ্ধতির বিপরীতে তারা বলছে নতুন এই সাশ্রয়ী টেস্ট কিটে থাকবে শুধুমাত্র একটু বিশেষ আবরণ-যুক্ত শক্ত কাগজ বা কার্ড-বোর্ড ও নমুনা সংগ্রহের জন্য ছোট সোয়াব। আর এতে মোট খরচ হবে ৫ মার্কিন ডলারেরও কম, যা কিনা বর্তমানের প্রায় ৮ ভাগের এক ভাগ। FDA এর প্রদত্ত অনুমোদন তথ্য অনুযায়ী তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চলমান। আগামী মাসের মধ্যেই প্রায় ১০ লক্ষ টেস্ট কিট উৎপাদন ও বিতরণের জন্য তারা প্রস্তুত হয়ে যাবে – এমনটাই চমকপ্রদ খবরের দাবিদার এই কোম্পানি।

Abbott এর এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনকে অনেক বিজ্ঞানীই বিশেষ সাধুবাদ জানিয়ে বলছেন যে আমরা হয়তো অবশেষে COVID19 শনাক্তকরণের জন্য একটি সুষ্ঠু ও সাশ্রয়ী বিকল্প পেয়ে গেলাম। যথাযথ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হলে খুব শীঘ্রই হয়তোবা আমরা মহামারী প্যান্ডেমিক-পরবর্তী একটু সুন্দর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারবো – বাচ্চারা আবার স্কুলে যেতে পারবে, কর্মজীবীরা ফিরে যেতে পারবে যার যার কর্মস্থলে আর জরুরী সেবা-দানকারী কর্মীরা আরও কিছুটা সুনিশ্চিত নিরাপত্তার সাথে নিজেদের কাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। একটি কার্যকারী COIVD19 ভ্যাকসিন এর জন্য পৃথিবী-বাসী যখন বুভুক্ষু এর মত অপেক্ষমাণ, সেখানে এমন সম্ভাবনাময় ও সুলভ মূল্যের একটি করোনা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন অপেক্ষার সময়টা হয়তো একটু সহজ ও নিরাপদ করে তুলবে।

অন্যদিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারী-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ Micheal Mina বলছেন যে এধরনের একটি প্রোটোটাইপ প্রযুক্তি নিয়ে এত শীঘ্র গণ-বিতরণ এর দিকে অগ্রসর হওয়াটা ঠিক সমীচীন নয়, যদিও এরূপ প্রযুক্তির গবেষণার একজন মূল স্টেকহোল্ডার ছিলেন তিনি নিজেই।

আমরা যদি একটু বিস্তর আলোচনার দিকে যাই, Abbott এর এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় মূলত যেকোন নমুনায় বিশেষ কোন ভাইরাল প্রোটিন চিহ্নিত করে তার ভিত্তিতে ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। স্বভাবতই এই প্রক্রিয়াটি স্বল্প-সময়ব্যাপী কিন্তু বিশ্বব্যাপী Gold-Standard হিসেবে স্বীকৃত RT-PCR Testing-এর চেয়ে তুলনামূলক কম সংবেদনশীল। RT-PCR Testing পদ্ধতিতে Viral Protein নয়, বরং Viral RNA শনাক্ত করে ফলাফল যাচাই করা হয়, যা কিনা প্রায় শতগুণ নিশ্চিত-কারী  Bio-Marker হিসেবে স্বীকৃত।

তাই এই সুলভ মূল্যের নতুন প্রক্রিয়ার মান যাচাই ও সফলতা সুনিশ্চিত করার জন্য কোম্পানিটি একটি অভিনব মান যাচাই পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। প্রায় ১০২ টি COVID19 নমুনাকে তারা উভয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করে এবং সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী নতুন Viral Protein শনাক্তকারী প্রক্রিয়াটি প্রচলিত RT-PCR প্রক্রিয়ার মত প্রায় সমান কার্যকরী হিসেবেই পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এখানে মূল সীমাবদ্ধতা রয়ে যাচ্ছে  মাত্র ১০২ টি নমুনা সংখ্যার ক্ষেত্রে, যা কিনা একটি স্ট্যান্ডার্ড ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য অপ্রতুল।

একটু গভীরে আলোকপাত করলে দেখা যায় যে FDA শুধুমাত্র ৭ দিন ব্যাপী COVID19 এর উপসর্গ প্রদর্শনকারী রোগীর ক্ষেত্রেই এই শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যাবহারের অনুমতি দিয়েছে। অতএব, এখনও পর্যন্ত সাধারণ যেকোনো ক্ষেত্রে গণ-মানুষের উপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে এখনো পর্যন্ত  Covid19 Carrier Screening বা করোনা ভাইরাসের বাহক চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, এই পদ্ধতিতে যেসকল ব্যক্তি Asymptomatic Carrier হিসেবে কোন উপসর্গ প্রদর্শন করা ছাড়াই এই ভাইরাস সংবহন করে যাচ্ছেন এবং অপর ব্যক্তির মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তাদেরকে পৃথকীকরণ সম্ভব নয়। অথচ বিশ্বব্যাপী epidemiological data অনুযায়ী কিন্তু এরূপ asymptomatic carrier এর সংখ্যাই সর্বাধিক এবং করোনা ভাইরাসের গণ-বিস্তারের জন্য এই বিশাল জনগোষ্ঠীই সর্বাধিক ভূমিকা পালন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের Scripps Research Institute এর সংক্রামক-ব্যাধি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ Kristian Andersen লক্ষ্য করছেন যে Abbott এর এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার সহযোগী হিসেবে তারা একটি Smartphone App তৈরি করেছে, যা কিনা একজন Negative tested ব্যক্তির পরিচয় ও শনাক্তকরণ পরীক্ষার ফলাফল বহন করবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ মতামত অনুযায়ী এই ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা ঠিক কতটুকু, এই বিষয়ে এখনও বেশ সন্দেহ রয়েছে। যেহেতু শুধুমাত্র উপসর্গ প্রদর্শনকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারযোগ্য, তাই false positive বা ভুল ফলাফল প্রদর্শিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু asymptomatic carrier এর ক্ষেত্রে অতীব নিম্ন মাত্রায় সংবেদনশীল এই পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে false positive এর সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যাবে, যা কিনা পরবর্তীতে ভয়াবহ এক পরিণতির সৃষ্টি করবে – এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

Mina ও Andersen এর মত প্রায় সকল বিশেষজ্ঞই অভিমত দিচ্ছেন এই পদ্ধতির সংবেদনশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে হলে উন্নত গবেষণা ও অধিক বর্ধিত-করণ প্রয়োজন। একটি অভিমত অনুযায়ী শনাক্তকরণের মূল পদ্ধতিকে দুইটি ধাপ বা পর্যায়ে বিভক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে স্বল্প-সংবেদনশীল সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হবে এবং এক্ষেত্রে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেই শুধুমাত্র দ্বিতীয় পর্যায়ের অধিকতর সংবেদনশীল পদ্ধতিতে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে। এরূপ দুই-স্তর বিশিষ্ট করোনাভাইরাস শনাক্তকারী পদ্ধতি প্রচলিত হলে, পরীক্ষার বিস্তর ব্যয়বহুলতার এই সমস্যা থেকে কিছুটা নিস্তার মিলবে।

এরকম আশা জাগানিয়া খবর বা যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন সম্বন্ধে হয়তো খুব নিকট ভবিষ্যতেই আমরা আরও অনেক হালনাগাদ তথ্য পাবো। তবে সেই পর্যন্ত নিজেদের ব্যক্তি-বিবেচনা ও যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনাই আমাদেরকে এই মহামারীর প্রাক্কালে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। শুধুমাত্র সময়ই বলে দেবে আমরা কত দ্রুত এই বিশ্বব্যাপী প্যান্ডেমিক থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারবো।


  • তারমীম নূর সকাল
  • শিক্ষার্থী, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

তথ্যসূত্র:

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button