আমরা কি ভাবতে পারি ব্যথানশক বা চেতনানাশক ছাড়াই আমাদের শরীরে চলছে অস্ত্রোপচার? কখনোই না। Anesthesia বা ব্যথানাশক ইনজেকশন এর উদ্দেশ্য থাকে অস্ত্রোপচারের সময় যাতে রোগী কোন ব্যথা অনুভব না করে। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা কিনা কোন ব্যথানাশক ছাড়াই সম্মুখীন হতে পারবে এমন অস্ত্রোপ্রচারের। কারণ শরীরের কোন অংশে ছিঁড়ে গেলে বা বড় কোন ক্ষত হলে তারা কোন ব্যথা ই অনুভব করেনা। এই বৈশিষ্ট্যকে কি আমরা Super humanity ভাবতে পারি? এই প্রশ্নের উত্তর হবে ‘না’। কারণ এই ধরণের বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে আসলে একটি বিশেষ রোগের লক্ষণ। CIPA -Congenital Insensitivity to pain with Anhidrosis হচ্ছে এমন একটি জেনেটিক রোগ যখন রোগী তার শরীরে কোন ব্যথা বা তাপমাত্রার পরিবর্তন অনুভব করতে পারেনা। এছাড়া আক্রান্ত রোগীদের শরীর কখনো ঘামায় না, যে অবস্থাটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলে Anhidrosis। 

কোন ব্যথার অনুভুতি না থাকার কারণে তাদের শরীর সম্মুখীন হয় অনেক বেশি কাটাছেঁড়া বা ক্ষতের, কারণ তারা তাদের শরীর নিয়ে অনেকটাই অসাবধান থাকে। যেমন ছোটবেলায় নিজের জিভ বা আংগুল জোরে কামড়ে ধরা, আগুনে শরীরের কোন স্থান পুড়ে যাওয়া বা খেলতে গিয়ে পড়ে হাত বা পায়ের হাড় ভেঙে ফেললেও তারা কোন ব্যথা অনুভব না করায় পরবর্তীতে এসব ক্ষত ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) রোগে রুপান্তরিত হয়, যেমন: হাড়ের ইনফেকশন বা Osteomyelitis। রোগের লক্ষণগুলো জন্মের পর থেকেই আক্রান্তদের শরীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে।

 

লক্ষনঃ

  • সবচেয়ে বেশি যে লক্ষণটি CIPA রোগীদের মধ্যে দেখা যায় তা হচ্ছে ছেলেবেলা থেকেই কোন ব্যথা পেলেও কান্নাকাটি না করা বা অনেক সময় খেয়াল-ই না করা।

 

  • স্বাভাবিক ক্ষেত্রে ঘাম হওয়ার কারণে আমাদের শরীরে তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু CIPA  আক্রান্তদের কখনো শরীর না ঘামানোর কারণে তারা প্রায়ই অতিরিক্ত তাপমাত্রাসহ জ্বরে আক্রান্ত হয়।

 

এই রোগের জন্য দায়ী জেনেটিক ফ্যাক্টর:

NTRK1 নামক একটি জিন-ই প্রধানত CIPA রোগের জন্য দায়ী। স্বাভাবিক ক্ষেত্রে এই জিন NTRK1 নামক receptor তৈরি করে যা স্নায়ুকোষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়। আর এই রিসেপ্টর এমন কিছু স্নায়ুকোষে(সেন্সরি) থাকে যা প্রধানত আমাদের ব্যথা, তাপমাত্রার অনুভুতি এবং স্পর্শ অনুভুতির জন্য দায়ী। NTRK1 জিনের এক ধরনের মিউটেশনের কারণে স্নায়ুকোষ গুলো আর এসব অনুভুতি বহন করতে পারে না এবং ক্রমান্বয়ে এসব স্নায়ুকোষ গুলো ধ্বংস হয়ে যায়। তাই সেন্সরি স্নায়ুকোষের অভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির থাকে না কোন ব্যথা বা স্পর্শের অনুভুতি। এই মিউটেটেড জিনটি বাবা ও মা থেকে অটোসোমাল রিসেসিভ প্যাটার্নে (Autosomal recessive pattern) সন্তানের জিনোমে সঞ্চারিত হয় অর্থাৎ বাবা এবং মা দুইজনের কাছেই যদি এক কপি করে CIPA মিউটেটেড জিন থাকে, তবেই সন্তান আক্রান্ত হয়।

রোগ নির্ধারণ পদ্ধতিঃ

সাধারণত মলিউকুলার জেনেটিক টেস্টিং এর মাধ্যমেই ক্লিনিকালি এই রোগ নির্ণয় করা হয়।

 

নিয়ন্ত্রিত জীবনঃ 

এই রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য এখনো কোন পদ্ধতিগত চিকিৎসা নেই। তাই নিয়ন্ত্রিত জীবন ব্যবস্থাই একমাত্র উপায়। সবসময় রোগীর নিজেকে বা তার পরিবারের সদস্যদের খেয়াল রাখতে হবে যাতে সে কোন ব্যথার সম্মুখীন না হয়। নিয়মিত তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নিতে হবে। এছাড়া নিয়মমাফিক অস্থি, চোখ ও ত্বক বিশেষজ্ঞের কাছে পরীক্ষা করাতে হবে যাতে রোগী কোন ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা শুরু থেকেই জানা যায়। 

এই রোগে আক্রান্তদের সহজ, স্বাভাবিক জীবন তখন ই নিশ্চিত হবে যদি তাদের কাছের মানুষজন সবসময় তাদের প্রতি যত্নবান ও বন্ধুসুলভ থাকেন।

ফাহমিদা খানম,

হেড অফ পাব্লিকেশন এন্ড রিসোর্স, বায়ো ডেইলি

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

References:

  1. https://www.verywellhealth.com/cipa-disease-when-a-person-can-t-feel-pain-4122549
  2. https://ghr.nlm.nih.gov/condition/congenital-insensitivity-to-pain-with-anhidrosis
  3. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK1769/

 

Previous articleব্যাকটেরিয়া মানুষের স্ট্রেস বা  মানসিক চাপ কমাতে পারে কি? 
Next articleবিশ্বে প্রচলিত এক অদ্ভুত খাদ্য নীতি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here