চিকিৎসকগণ সবসময়ই আমাদের পরামর্শ দেন, ব্যবস্থাপত্র (prescription) অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট ডোজের নির্দিষ্ট ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করবার। এরপরও অনেকেই তা করেন না। সাধারণত এন্টিবায়োটিক এবং বিভিন্ন ক্রনিক (chronic) অর্থাৎ দীর্ঘদিনব্যাপী যেসব রোগ থাকে, সেসব রোগের ক্ষেত্রেই মানুষ কিছুদিন ওষুধ গ্রহণ করে এরপর ছেড়ে দেন যেহেতু সেগুলো দীর্ঘদিন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সারাজীবন গ্রহণ করতে হয়। খুব বেশি দেখা যায় এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদী রোগ হল উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস।  

 

CDC (The Centers for Disease Control and Prevention)  এর একটি পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগ ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী রোগের চিকিৎসা ব্যর্থ হয় ওষুধ মাঝপথে ছেড়ে দেয়ার কারণে। ফলে রোগ আরও গুরুতর পর্যায়ে চলে যায়, অনেক সময় হয় অকাল, অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। শতকরা ২৫ থেকে ৫০ ভাগ রোগী যাদের কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ দেয়া হয়, ওষুধ ছেড়ে দেয়ার কারণে এক বছরের মধ্যে তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যায় শতকরা ২৫ ভাগ। 

 

আসুন প্রথমে দেখি ওষুধ ছেড়ে দেয়ার কিছু কারণ:

 

  • অর্থ: আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ওষুধ ছেড়ে দেয়ার একটি প্রধান কারণ। নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, অনেকেই দীর্ঘদিন অপেক্ষাকৃত দামী ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন না আর্থিক টানা-পোড়েনের কারণে। 
  • ব্যবস্থাপত্র না বোঝা: ব্যবস্থাপত্র সঠিকভাবে বুঝতে না পারাও একটি অন্যতম কারণ ওষুধ ঠিকভাবে না গ্রহণের। চিকিৎসকগণ যথেষ্ট সময় নিয়ে ওষুধ গ্রহণ সম্পর্কে রোগীকে বুঝিয়ে দিলে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব। 
  • ওষুধ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা: আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি অন্যতম কারণ হল ওষুধ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা। অনেক চিকিৎসক ওষুধ লেখার পর রোগীকে ঠিকভাবে বুঝিয়ে দেন না, কেন তাকে ওষুধগুলো  দেয়া হল। আবার অন্যদিকে, আমাদের দেশে চিকিৎসকদের উপর রোগীদের আস্থা কম, যার কারণে শুধুমাত্র ব্যবস্থাপত্রের ভিত্তিতে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও দীর্ঘদিন একটানা ওষুধ গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন।  
  • ভুলে যাওয়া: বয়স্ক ব্যক্তিরা কিংবা স্মৃতিলোপ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় ভুলে যাওয়ার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন না। 
  • বিভিন্ন রোগের ওষুধ: একই ব্যক্তিকে অনেক রোগের ওষুধ দেয়া হলে তারা অনেক সময় সুষ্ঠুভাবে সমন্বয় করতে পারেন না। 
  • পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া: বিভিন্ন রোগের (যেমন- ক্যান্সার) ওষুধ গ্রহণের ফলে অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ কারণে রোগীরা ওষুধ খেতে চান না।  

 

ওষুধ ছেড়ে দিলে সমস্যা কী? 

 

এন্টিবায়োটিকের নির্দিষ্ট ডোজ সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ না করলে তা শরীরে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করতে পারে অর্থাৎ পরবর্তীতে ওই ওষুধ আর উক্ত রোগীর শরীরে কাজ করবে না। এ থেকে জটিল অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে রক্তে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার কারণে। 

ক্রনিক রোগের ওষুধ ঠিকভাবে গ্রহণ না করলে আপাতদৃষ্টিতে কোন সমস্যা সৃষ্টি না করা রোগগুলোও দীর্ঘদিনের অবহেলায় শরীরে নানারকম অসুস্থতার লক্ষণ তৈরি করতে পারে। যার ফলে গুরুতর অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। 

কে না জানে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস এসব রোগের গুরুতর হওয়া ঠেকাতে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ আবশ্যক। 

 

চিকিৎসকের সহানুভূতিশীল আচরণের মাধ্যমে রোগীকে ঠিকভাবে বুঝিয়ে দেয়া ওষুধের গুরুত্ব, পারিবারিক সচেতনতা এবং ব্যক্তির নিজের বিজ্ঞানমনস্ক মন সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের জন্য অপরিহার্য। 

 

তথ্যসূত্র: 

  ১। Why You Need to Take Your Medications as Prescribed or Instructed | FDA 

  ২। Definition of chronic disease – NCI Dictionary of Cancer Terms 

 

পঙক্তি আদৃতা বোস

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা- ১১০০। 

 

Previous articleস্তন ক্যান্সারের ধাপসমূহ এবং ঘরোয়া উপায়ে নির্ণয় পদ্ধতি – পর্ব: ২
Next articleমস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ায় খাদ্যের ভূমিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here