Medical Science

মস্তিষ্কের চেতনা রহস্য (নিউরাল কোরিলেটস অব কনশাসনেস)

মানবদেহের সবচেয়ে জটিল, রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে ব্রেইন বা মস্তিষ্ক।।মানব অস্তিত্বের সবকিছু মস্তিষ্ক দ্বারা পরিচালিত হয়। মস্তিষ্ক সম্পর্কিত আত্ম-জ্ঞান এবং মানুষের মাঝে ব্যবধান হচ্ছে এক মহাসমুদ্রের। এই মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে মস্তিষ্ক সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান লাভ করতে পারলেই মানুষ দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গকে ব্যবহার করতে পারবে পরিপূর্ণভাবে। তবে ইতোমধ্যে,মানুষ এই মস্তিষ্ক কে কাজে লাগিয়ে মহাশূন্যে যাতায়াত করতে, রোগ নির্মূল করতে এবং এমনকি মৌলিক কণাগুলির ক্ষুদ্র পর্যায়ের গতি প্রকৃতি বুঝতেও শিখে গেছে।

মস্তিষ্ক এমন একটি বিস্ময়কর সত্ত্বা যার বিষয়ে যত জানা যায় ততই অবাক হতে হয়। উদাহরণস্বরুপ, মানুষের এই মস্তিষ্ককে যদি অর্ধেক কেটে ফেলা হয় তাহলেও বাকি অংশটুকু কেটে ফেলা অংশের কাজ করার সামর্থ  রাখে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, আপনার মস্তিষ্ক অর্ধেক কেটে ফেলা হলো এবং সেই অংশটুকু যদি অন্যকোন যায়গায় স্থাপন করা হয় তাহলে কোন অংশটুকুকে নিজের ধরবেন আবার,আপনি কোন ঘটনা দেখে কোন কিছু চিন্তা করলেন কিন্তু কি চিন্তা করলেন সেটা আপনি ছাড়া এই পৃথিবীর আর কেও জানতে পারবে না,এই যে নিজের আত্ম-অভিজ্ঞতা, যেটি শুধু আপনিই অনুধাবন করছেন সেটাই আপনার চেতনা। তবুও এই একটি জিনিসের উপর সকলের ধারণা এখনো অস্পষ্ট। সে বিষয়ে বিস্তারিত যাওয়ার আগে “চেতনা কি” সে বিষয় নিয়ে আরেকটু জানা যাক।

চেতনা হলো মস্তিষ্কের শত কোটি কোটি নিউরনের একত্রে কাজ করার ফলে উত্থিত সেই সব অভিজ্ঞতা যা বিশ্ব সম্পর্কে জানতে এবং অন্যকে তা জানাতে সাহায্য করে। এর সরলতম উদাহরণ হিসেবে বলা যায় “অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক অস্তিত্ব সম্পর্কে সংবেদনশীলতা বা সচেতনতা”।

প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানীরা এখন ‘মস্তিষ্কের চেতনা’ বিষয়ে বোঝার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েছেন, এর পিছনে অবশ্য কিছু কারণও রয়েছে। কিন্তু আজ থেকে ১০০ বছর আগেও যখন বিজ্ঞানীদের আবিস্কারের জোয়ারে ভাসছিলো মানুষ।মনোবিজ্ঞানীগন মানুষের আচার আচরণ নিয়ে গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করলেন। এর পাশাপাশি নিউরোসায়েন্টিস্টগণ মস্তিষ্কের সকল বিষয়ে গবেষণার সাফল্য অর্জন করলেন।কিন্তু মস্তিষ্কের চেতনা বিষয়টিকে তারা একপ্রকার বাদই দিয়ে দিলেন এমনকি তার উপর বিন্দুমাত্র দৃষ্টিপাতও করলেন না।কিন্তু বর্তমান গবেষণায় দেখা গেলো মানব কাজের সকল উৎস এই চেতনা। চেতনা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে ইহজাগতিক যাবতীয় সকল বিষয়ে পরিপূর্ণ দর্শন সম্ভব নয়।

Rene Descartes দেহ ও মস্তিষ্কের চেতনার দ্বৈততা বা ডুয়ালিজমের ধারণা দিয়ে বলেছিলেন ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’ (cogito ergo sum)। মস্তিষ্ক এবং এর সকল স্নায়ুকোষ এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডকে বিবেচনা করে তিনি মানবদেহকে একটি মেশিনের সাথে তুলনা করেছেন।

মানুষের হাসি-কান্নাই শুধু নয়,বরং ব্যাথা-বেদনা, আর্তনাদ-চিৎকার, অশ্রু সব কিছুর আড়ালেই মস্তিষ্কের চেতনা কাজ করছে। তবে এই সকল কোন কথাই আমার নয়, এগুলো বলে গেছেন যীশু খৃষ্টের জন্মেরও আরো ৪০০ বছর আগের চিকিৎসকরা। কিন্তু তাঁদের সেই জ্ঞানটি সে কালের মানুষ গ্রহণ করেনি। তাদের  মধ্যে অনেকের বিশ্বাস ছিলো সকল হার্দিক অনুভূতির উৎস হলো হৃৎপিণ্ড,যার কম্পনের ফলেই বুকের মাঝে সকল অনুভুতির সৃষ্টি হয় এবং একথা সকল প্রেমিকমাত্রই দাবী করে থাকেন। প্রাচীন আসিরিয় ও ইহুদিরা বিশ্বাস করত যে লিভার বা যকৃত থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি। অবশ্য প্রাচীন যুগে পর্যায়ক্রমে মানুষের প্রায় সকল প্রত্যঙ্গই চেতনার উৎস বলে একসময়-না-একসময়ে মনে করা হতো।

এই ভূতুড়ে মস্তিষ্কের চেতনা সম্পর্কিত জ্ঞান আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ‘সায়েন্স অ্যাডভান্স’ এ প্রকাশিত নতুন রিসার্চ পেপারটি (Human consciousness is supported by dynamic complex patterns of brain signal coordination) মস্তিষ্কের যে নেটওয়ার্কগুলি কাজ করছে এর বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে।তাছাড়া মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাতের পরে রোগী “সচেতন” কিনা তা নির্ধারণ করা চিকিৎসক এবং পরিবার, উভয়েরই তাদের পরিচর্যার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে,কেননা  আধুনিক মস্তিষ্কের ইমেজিং কৌশলগুলি এই অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলতে শুরু করেছে, যা আমাদের মানবিক চেতনায় অভূতপূর্ব অন্তর্দৃষ্টি দিতে বাধ্য করছে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা জানি যে, “প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স” বা “প্রিফিউনিয়াস” সহ জটিল মস্তিষ্কের অঞ্চলগুলি, যা অনেকগুলি উচ্চতর জ্ঞানীয় কার্যের জন্য দায়ী, সাধারণত সচেতন চিন্তায় জড়িত। তবে মস্তিষ্কের “বৃহত অঞ্চলগুলিও” অনেক কিছুই করে থাকে যেসকল কাজ সম্পর্কে আমরা এখনো অবগত নই সুতরাং বলা যেতে পারে নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের স্তরে মস্তিষ্কে “সচেতনতাকে” কীভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে তা এখনো সবার কাছে অপরিস্কারই রয়ে গেছে।

“মস্তিষ্কের চেতনা” নিয়ে অধ্যয়ন করা এত কঠিন হওয়ার পেছনে কারণ হল এগুলি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ এবং সহজে কোন কিছু এটিতে প্রবেশ করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, আমরা দুইজন ব্যক্তি দেয়ালে ঝুলছে এমন একই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি, তবে ছবিটি দেখার পরবর্তী অনূভুতি বা আমরা দুইজন কি অনুরূপ ভাবছি কিনা তা জানার কোনও উপায় নেই, যদি না দুইজনই সেই সম্পর্কে না বলি। কেবল সচেতন ব্যক্তিদেরই বিষয়গত অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। 

এই বিষয়গুলো এতো সূক্ষ্ম ও জটিল যে বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের চেতনা নিয়ে একত্রে কাজ করেও এর কোন অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করতে পারেন নি। তারা ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোনান্স ইমেজিং (এফএমআরআই) এর মাধ্যমে ১২৫ জন ব্যক্তির মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ পরীক্ষা করেছিলেন। যেখানে স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলগুলির মধ্যে জটিল ও তীক্ষ্ণ যোগাযোগ প্রদর্শন করেছিল। তবে অদ্ভুতভাবে দূর্বলদের মস্তিষ্কের বেলায় সেটা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিল। জটিল যোগাযোগের ক্ষেত্রে যখন স্বাস্থ্যবান ব্যাক্তিদের চেতনানাশক দেয়া হত, তখন তাদের মধ্যে এই জটিল যোগাযোগের ধরণটি হারিয়ে যেত। কিন্তু কিভাবে সেটি সম্ভব হলো, তার কোন যথোপযুক্ত উত্তর তারা দিতে পারেন নি।

বিজ্ঞানী ছাড়াও সমাজের বাইরের বিভিন্ন সংস্কৃতির দার্শনিকরাও এই “চেতনা” নামের গবেষণাক্ষেত্রটির সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা করেছেন। কিন্তু সম্পুর্ণ সফল কেও হতে পারে নি এবং অদূর ভবিষ্যতে পারবেন কিনা সেই প্রশ্ন এই বিশাল মস্তিষ্ক ভান্ডারের কোন এক ছোট্ট কোটরে রেখে দেয়াই যেতে পারে। 


রাফায়েতুল ইসলাম রুপম 

ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://advances.sciencemag.org/content/5/2/eaat7603 
  2. http://sitn.hms.harvard.edu/flash/2019/scientists-identify-brain-patterns-associated-consciousness/  
  3. https://www.discovermagazine.com/mind/researchers-think-theyve-identified-the-brain-pattern-that-signals-consciousness 
  4. https://www.sciencedaily.com/releases/2019/05/190501153354.htm 
  5. Consciousness: A Very Short Introduction by Susan Jane blackmore (Book)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button