Health

নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস!

১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী,চীনে প্রায় ১১৬ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত যা বিশ্ব রেঙ্কিং এ প্রথম। বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বাংলাদেশে প্রতি ১১ জনের ১ জন এই নীরব ঘাতকের শিকার। নীরব ঘাতক বলার কারণ এর লক্ষণ সহজে ধরা পড়ে না। বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের ৫৭% মানুষই তাদের ডায়াবেটিস আছে এই বিষয়ে অবগত নন। যার ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই।

ডায়াবেটিস কি? 

ডায়াবেটিস মেলিটাস যা ডায়াবেটিস নামে পরিচিত। ডায়াবেটিস মূলত একটি বিপাকীয় রোগ যা রক্তে উচ্চ শর্করার  মাত্রা নির্দেশ করে।

ডায়াবেটিস কেন হয়?

যখন অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করে না আর করলেও খুব অল্প পরিমাণে করে বা যখন শরীর ইনসুলিনের জন্য যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া না দেয় তখনই হতে পারে ডায়াবেটিস। 

ডায়াবেটিস অনেক রকম হলেও মোটা দাগে ডায়াবেটিস প্রধানত ২ ধরনের। 

▪️ টাইপ ১ ডায়াবেটিস 

▪️ টাইপ ২ ডায়াবেটিস

◾ টাইপ ১ ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ: 

টাইপ ১ ডায়াবেটিস ‘জুভেনাইল ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন-নির্ভর ডায়াবেটিস’ হিসেবে পরিচিত, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা, যাতে অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করে না বা অল্প পরিমাণে তৈরি করে। সাধারণ শিশু ও তরুণদের মাঝে দেখা যায়।

টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সঠিক কারণটি এখনো অজানা। তবে মূল কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়-

▪ অটোইমিউন সিস্টেমঃ

দেহের প্রতিরক্ষা কোষগুলো সাধারণত ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এ কোষগুলো ভুলভাবে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী (আইলেট, বা ল্যাঙ্গারহানসের আইলেটস) কোষগুলিকে ধ্বংস করে দেয়। 

▪️ পারিবারিক ইতিহাসঃ 

যদি পরিবারের সদস্যদের কারো টাইপ-১ ডায়াবেটিস থাকে তবে পরবর্তী জেনারেশনে তা বিকাশের সম্ভাবনা বেশি।

এছাড়াও অন্যান্য কারণগুলো-

▪ জিনগত কারণ

▪ ভাইরাসের সংস্পর্শ

▪ পরিবেশগত কারণ 

◾ টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ:

টাইপ ২ কে ‘এডাল্ড অনসেট ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন-অনির্ভর ডায়াবেটিস’ বলা হয়। সাধারণত মধ্যবয়সী বা বয়স্ক মানুষদের মধ্যেই দেখা যায়,তবে অল্পবয়সীদের মধ্যেও ঘটে থাকে। টাইপ ২ ডায়াবেটিস দেখা দিলেও শরীর তখনও কিছুটা ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু তার পরিমাণ যথেষ্ট হয় না, অথবা দেহ ইনসুলিনকে শনাক্ত করতে পারে না বা তখন উৎপন্ন হওয়া ইনসুলিন যথাযথভাবে কাজ করে না। 

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও এর মূল কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়-

▪ অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারাঃ

অনিয়মিত খাদ্যাভাস ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই রোগের অন্যতম কারণ। স্থূলতার জন্য শরীরের চর্বির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারনে ইনসুলিন হরমোনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হয়।ফলে শরীরের গ্লুকোজ শক্তিতে রুপান্তরিত হতে পারে না।এরপর শরীরের গ্লুকোজের পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকে। একে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। 

▪ জিনগত কারনঃ 

অসংখ্য জিন টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার জন্যে দায়ী। ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩৬টির মতো জিন আবিষ্কার হয়েছে যা এই রোগ হওয়ার জন্যে দায়ী। অভিন্ন যমজের মধ্যে একজনের টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে অপরজনের হওয়ার সম্ভাবনা ৯০% থাকে আর ভিন্ন হলে ৩০-৫০% সম্ভাবনা থাকে। কিছু লোকের ক্ষেত্রে লিভার খুব বেশি গ্লুকোজ উৎপাদন করার কারণেও এমন হয়।

এছাড়াও রয়েছে-

▪ পরিবেশগত কারণঃ

দূষিত বায়ু,পানি, ভিটামিন ডি এর ঘাটতি, এন্টারোভাইরাসের সংস্পর্শ ও প্রতিরোধক কোষের ক্ষতি ইত্যাদি ডায়াবেটিস রোগের ইটিওপ্যাথোজেনেসিসে ভূমিকা রাখে। 

ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো কি? 

ডায়াবেটিসের অনেক লক্ষণ থাকলেও

প্রধান লক্ষণ হলো ৩টি।

▪ পলিইউরিয়া বা ঘন ঘন মূত্রত্যাগ

▪ পলিডিপসিয়া বা অত্যধিক পিপাসা

▪ পলিফেজিয়া বা অত্যধিক ক্ষুধা

এই লক্ষণ ৩টি টাইপ ১ ও টাইপ ২ উভয় ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। 

◾ টাইপ ১ ডায়াবেটিসের লক্ষণঃ

• ঘন ঘন মূত্রত্যাগ 

• চরম তৃষ্ণা

• ক্ষুধা বৃদ্ধি (বিশেষত খাওয়ার পরেও)

• শুষ্ক মুখ.

• পেট খারাপ এবং বমি বমি ভাব

• অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস 

• ক্লান্তি

• ঝাপসা দৃষ্টি

• শ্বাস ভারী হওয়া (একে Kussmaul Respiration বলা হয়)

• ত্বক, মূত্রনালী বা যোনিতে ঘন ঘন সংক্রমণ

• ক্র্যাঙ্কনেস বা মেজাজের পরিবর্তন

• শিশুদের ক্ষেত্রে বিছানা ভিজিয়ে ফেলার সমস্যা দেখা যায় 

★জরুরী অবস্থার লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

• কাঁপুনি এবং দ্বিধান্বিত থাকা

• দ্রুত শ্বাস – প্রশ্বাস

• নিঃশ্বাসে মিষ্টি গন্ধ 

• পেট ব্যথা

• চেতনা হ্রাস (কম দেখা যায়)

◾ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের লক্ষণঃ 

লক্ষণগুলো খুব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, তাই অধিকাংশ সময়ই তা লক্ষ্য করা হয় না। যার ফলে বিশ্বের প্রায় ৮ মিলিয়ন মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত।

• ঘন ঘন মূত্রত্যাগ 

• খুব তৃষ্ণার্ত 

• ক্ষুধা

• ঝাপসা দৃষ্টি

• ক্রাঙ্কি 

• হাত বা পায়ের অসাড়তা

• ক্লান্তি

• ক্ষত সহজে শুকায় না

• বার বার ইস্ট সংক্রমণ

• ওজন হ্রাস

• ঘাড়ে বা বগলের চারপাশে কালো দাগ (acanthosis nigricans বলা হয়) যা প্রায়শই ইনসুলিন প্রতিরোধের লক্ষণ হয়ে থাকে।

ডায়াবেটিসের জটিলতাগুলো কি? 

ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদী জটিলতাগুলোর ধীরে ধীরে বিকাশ ঘটে ও প্রকাশ লাভ করে। আপনার ডায়াবেটিসের মাত্রা যত বেশি এবং আপনার রক্তের শর্করাকে যত কম নিয়ন্ত্রণ করবেন, আপনার ডায়াবেটিসের জটিলতার ঝুঁকি তত বেশি।

জটিলতা গুলো হলঃ

▪ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিস বা হৃদরোগ

▪ স্নায়ুর ক্ষতি (নিউরোপ্যাথি)

▪ কিডনির ক্ষতি (নেফ্রোপ্যাথি)

▪ চোখের ক্ষতি (রেটিনোপ্যাথি)

▪ পায়ের ক্ষতি 

▪ ত্বকের সমস্যা (ব্যাকটেরিয়াল ও ফাঙ্গাল ইনফেকশন) 

▪ শ্রবণ বৈকল্য

▪ আলঝেইমার রোগ

▪ হতাশা 


ফাওজিয়া আফরিন অরিন

কৃষি অনুষদ (৫৭ ব্যাচ)

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় 

রেফারেন্স সমূহঃ 

➤https://www.mayoclinic.org/diseases-conditions/type-1-diabetes/symptoms-causes/syc-20353011#:~:text=The exact cause of type,Langerhans) cells in the pancreas.

➤https://www.mayoclinic.org/diseases-conditions/type-2-diabetes/symptoms-causes/syc-20351193#:~:text=Type 2 diabetes develops when,seem to be contributing factors.

➤https://www.mayoclinic.org/diseases-conditions/diabetes/symptoms-causes/syc-20371444

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button